আজ ১০ই মহররম পবিত্র আশুরা দিবস।
প্রধান বার্তা সম্পাদক ও প্রকাশক- জাহারুল ইসলাম জীবন এর লেখা ও সম্পাদনায় রচিত বিশেষ ইসলামিক প্রতিবেদন।
আজ ২৬ ই জুন-২০২৬ ইং, রোজ শুক্রবার সারা মুলিম উম্মাহর দেশে গুলিতে পালিত হচ্ছে পবিত্র ১০ই মহররম ও আশুরা দিবস! এই ১০ই মহররম ও আশুরার অন্তর্নিহিত তত্ত্বের তাত্ত্বিকতা বিশ্লেষণ পূর্বক ইসলামিক ইতিহাসের চলমান পাতার ক্যালেন্ডারে মর্মান্তিক রক্তস্নাত দৃশ্যমানের পটভূমিতে প্রকৃত মুসলিমদের অন্তরে বেদনা বিদুর দিবসের আলোকে অন্যতম পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ মাস এই মহররম। এটি কেবল একটি নতুন বছরের সূচনা নয়, বরং এটি আত্মত্যাগ, সত্যের পুনর্জাগরণ এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য স্মারক। বিশেষ করে এই মাসের ৯ ও ১০ই মহররম (আশুরা) মুসলিম উম্মাহর জন্য এক গভীর আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে। একদিকে এটি বনি ইসরাইলের মুক্তি ও মুসা (আঃ)-এর বিজয়ের মাধ্যমে আল্লাহর রহমতের দিন, অন্যদিকে এটি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর প্রিয় দৌহিত্র, জান্নাতের যুবকদের সর্দার হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের কারবালার প্রান্তরে সত্যের জন্য আত্মোৎসর্গের এক চরম শোকাবহ ও গৌরবোজ্জ্বল দিন।
***➤ঐতিহাসিক পটভূমি: মুসা (আঃ) থেকে কারবালা:- ঐতিহাসিকভাবে আশুরার দিনটি বহু অলৌকিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। সহীহ্ বুখারীর হাদিস অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সঃ) যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন ইহুদিদের এই দিনে রোজা রাখতে দেখে কারণ জানতে চান। তারা জানায়, এই দিনে আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আঃ) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে সলিল সমাধি করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেছিলেন,
➤"মুসা (আঃ)-এর ওপর তোমাদের চেয়ে আমাদের অধিকার বেশি।" (সহীহ্ বুখারী, হাদিস নং- ২০)
➤অতঃপর তিনি ১০ই মহররমের রোজার সাথে ইহুদিদের সাদৃশ্য বর্জন করতে ৯ই মহররম অথবা ১১ই মহররম যুক্ত করে "দো-রোজা" রাখার সুন্নাত শিক্ষা দেন।
কিন্তু হিজরি ৬১ সনের ১০ই মহররম কারবালার তপ্ত বালুচরে ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী মর্মার্থক অধ্যায় রচিত হয়। এটি ছিল ইয়াজিদের স্বৈরাচারী, অনৈসলামিক এবং জালিম শাসনের বিরুদ্ধে ইমাম হুসাইন (রাঃ)-এর আপসহীন সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি। শুষ্ক, পানিবন্দী ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় নিজ পরিবারের শিশু আলী আজগরসহ ৭২ জন সঙ্গী নিয়ে তিনি যে শাহাদাত বরণ করেন, তা কেবল একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ ছিল না, তা ছিল কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানবজাতির জন্য সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন পার্থক্যের এক স্বর্গীয় নকশা।
***➤আধ্যাত্মিকতার আলোয় কারবালার রহস্যে আল্লামা ইকবালের দর্শন:- কারবালার এই মহান আত্মত্যাগকে আধ্যাত্মিকতার চরম শিখর হিসেবে আখ্যায়িত করে মহাকবি আল্লামা ইকবাল বলেছিলেন:
➤"নকশে ইল্লাল্লাহ বার সাহারা নবীস / সাত্রে উনুয়া সে নাজাতে মা নবীস।"
ইমাম হুসাইন (রাঃ) কারবালার জমিনকে কাগজ এবং নিজের বুকের তাজা রক্তকে কালি বানিয়ে তৌহিদের যে কালজয়ী নকশা এঁকে গেছেন, তা-ই মূলত 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর প্রকৃত রূপ। বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইমাম হুসাইন (রাঃ) শহীদ হয়েছেন, কিন্তু আধ্যাত্মিক ও আদর্শিক দৃষ্টিতে তিনি ইসলামকে চিরদিনের জন্য জীবিত করে গেছেন। ইয়াজিদ সাময়িকভাবে জয়ী হয়েও ইতিহাসে চিরঘৃণিত, আর হুসাইন (রাঃ) মুমিনদের হৃদয়ে ও জান্নাতের সর্দার হিসেবে চির-অমর।
***➤সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে্ বাহ্যিক ইবাদত বনাম চারিত্রিক মোনাফেকি:- আজকের সমসাময়িক মুসলিম সমাজের দিকে তাকালে এক চরম নৈতিক বিপর্যয় ও বিভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। একদিকে সমাজে জামাতে নামাজ পড়ার তাগিদ, দাড়ি-টুপি-জুব্বার বাহ্যিক লেবাসের প্রাচুর্য, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভেজাল, সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে ঘুষ, দুর্নীতি এবং সামাজিক অবিচার।
হাদিস গ্রন্থ "মুসনাদে আহমাদ"- এ বর্ণিত শক্তিশালী হাদিসে হযরত আবূদ দারদা (রাঃ) সমসাময়িক যুগের মানুষদের দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন,
➤"আমি এদের মধ্যে মুহাম্মদ (সঃ)-এর কোন নিয়ম-রীতি দেখতে পাচ্ছি না, শুধু এতটুকু ছাড়া যে এরা জামাতে নামাজ আদায় করে।"
➤আজকের বাস্তবতাও ঠিক তাই। নামাজে দাঁড়িয়ে আমরা প্রতিদিন বলছি, "ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তায়ীন" (আমরা কেবল তোমার-ই ইবাদত করি এবং তোমার-ই সাহায্য চাই), অথচ নামাজ শেষে বাস্তব জীবনে আল্লাহর বিধানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হচ্ছি। এই কাপট্য বা মোনাফেকি কারবালার সেই কুচক্রী নামাজীদের কথাই মনে করিয়ে দেয়, যারা আসরের নামাজ কাজা হওয়ার ভয়ে ইমাম হুসাইন (রাঃ)-এর শিরশ্ছেদ করতে তাড়াহুড়ো করছিল! বাহ্যিক ইবাদত যদি অন্তরে 'হুজুরিল কালব' বা আল্লাহর ভয় জাগ্রত করতে না পারে, তবে সেই ইবাদত মূল্যহীন।
***➤আহলে বাইতের মহব্বত-ই ঈমানের মূল ভিত্তি:- কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন:
➤"বলুন, আমি আমার রিসালাতের দায়িত্ব পালনের জন্য তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না, কেবল আমার নিকটাত্মীয়দের (আহলে বাইত) প্রতি সৌহার্দ্য ও ভালোবাসা ব্যতীত।" (সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ২৩)
➤হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের প্রাণের চেয়েও রাসুল (সঃ) এবং তাঁর পরিবারকে বেশি ভালোবাসবে। অথচ আজকের মুসলিম উম্মাহর বড় একটি অংশ মহররমের এই গভীর শোক ও ত্যাগের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ। অনেকে ১০ই মহররম কেবল ভালো-মন্দ খেয়ে উৎসব পালন করে, অথচ নবী পরিবারের সদস্যদের তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় নির্মমভাবে শহীদ করার ইতিহাসকে এড়িয়ে যায়। আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন এবং কারবালার জালিমদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা প্রতিটি সাচ্চা মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব। এই কাঁন্না বা শোক কেবল আবেগ নয়, এটি জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নীরব ও শক্তিশালী আধ্যাত্মিক সংগ্রাম।
***➤আশুরার আমল ও আমাদের করণীয়:- পবিত্র আশুরার দিনটিকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে দুটি চরমপন্থী দল দেখা যায়-একদল কারবালার শোকের কারণে রোজা রেখে মাছ-মাংস বর্জন করে চরম কৃচ্ছ্রসাধন করে, অন্যদল নবী পরিবারের এই দুঃখের দিনে ভালো খাবার খেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে (যা মূলত বনি উমাইয়াদের কুপ্রথার অংশ)। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হলো মধ্যপন্থা।
***➤এই পবিত্র দিনগুলোতে আমাদের করণীয় আমলসমূহ:-
১.➤সুন্নাত রোজা পালন:- ৯ ও ১০ই মহররম অথবা ১০ ও ১১ই মহররম রোজা রাখা, যা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা (সহীহ্ মুসলিম)।
২.➤তওবা ও ইস্তিগফার:- এই দিনে আল্লাহ তাআলা বহু জাতির তওবা কবুল করেছেন, তাই বেশি বেশি নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।
৩.➤আহলে বাইতের প্রতি দরুদ ও স্মরণ:- নামাজে যেভাবে আমরা 'আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ' পড়ে আহলে বাইতের ওপর দরুদ পড়ি, তেমনি এই দিনে ইমাম হুসাইন (রাঃ) ও কারবালার শহীদদের আত্মত্যাগের ইতিহাস স্মরণ করে নিজের জীবনকে সত্যের পথে পরিচালিত করার অঙ্গীকার করা।
৪.➤মানবসেবা ও উদারতা:- পরিবার ও অভাবগ্রস্তদের প্রতি সদয় হওয়া এবং দান-সদকা করা।
***➤সর্বপরি ইসলামে মুক্তির পথ ও আলো প্রাপ্তির চূড়ান্ত প্রত্যয়:- মহররম ও আশুরার মূল শিক্ষা শিয়া বা সুন্নি ফেরকাবাজির ঊর্ধ্বে। হাশরের ময়দানে কোনো দলীয় ফতোয়া কাজে আসবে না, বরং মানুষের আমল এবং রাসুল (সঃ) ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি নিখাদ ভালোবাসাই হবে নাজাতের উসিলা। আসুন, এই পবিত্র আশুরায় আমরা কেবল বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে, কারবালার আধ্যাত্মিক চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করি। সমাজ থেকে ঘুষ, দুর্নীতি, ভেজাল ও মোনাফেকি দূর করে ইমাম হুসাইন (রাঃ)-এর মতো সত্য, ন্যায় ও ইনসাফের ঝান্ডা ঊর্ধ্বে তুলে ধরার দীপ্ত শপথ গ্রহণ করি। প্রকৃত ইসলাম সমন্ধে মহান আল্লাহ্ তাআলা আমাদের সকলকে সত্য সুন্দর ও সঠিক তথ্য জানা এবং বোঝার মাধ্যমে ইসলামের অমিও ধারার বাণী ও মসুলমানের প্রকৃত পরিচয় এবং ধর্ম সমূহ্ পূর্ণাঙ্গ ঈমানের সহিত পালন করার তৌফিক দান করুন- আমিন।
প্রধান উপদেষ্টা :সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ মনিরুজ্জামান, উপদেষ্টা :এস এম আজিজুর রহমান স্বপন, প্রধান প্রকাশক ও সম্পাদক : শেখ শাহীন, সহযোগি সম্পাদক : মোসা: শেখ মাজেদা, নির্বাহী সম্পাদক : ফাতেমা বেগম, সম্পাদক শেখ জান্নাতুল ফেরদাউস,সম্পাদক : শেখ শারফিয়া মরিয়ম,সম্পাদক এ্যাড:ফারুক হোসেন,প্রকাশক ও প্রধান বার্তা সম্পাদক :জাহারুল ইসলাম জীবন, বার্তা সম্পাদক - আশিষ সাহা, বার্তা সম্পাদক অমিত তালুকদার,বার্তা সম্পাদক গাজী মনিরুজ্জামান মনি,প্রবাসী সম্পাদক :মোঃ সেলিম রানা,হেড অফ মার্কেটিং মোঃ মামুন মোল্লা,অফিস সম্পাদক মোঃ রোমেল হোসেন।
অফিস ঠিকানা:কর্পোরেট অফিস :৫৫/বি নোয়াখালী টাওয়ার লিফটের ১৬ রুম নং ১৬/২ ঢাকা-১০০০ আঞ্চলিক অফিস :ডাকবাংলা মোড় আকাঙ্ক্ষা টাওয়ার লিফটের ৫ রুম নং ৫/বি২ খুলনা মোবাইল নাম্বার: অফিস 01911223672, প্রধান প্রকাশক ও সম্পাদক 01811441416, বার্তা সম্পাদক-01974580945
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক ঢাকার সময় । Website: www.thedhakersomoy.com