"তাহিরপুর: একজনের পোস্ট, এক সম্প্রদায়ের শাস্তি"
বার্তা সম্পাদকঃ সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যা ঘটেছে, তা কেবল একটি ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের আইন, ন্যায়বিচার ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সম্পর্কে এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। একজন তরুণের ফেসবুক আইডি থেকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলা হয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠান। অর্থাৎ রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন শুরু করে।
কিন্তু তারপরও থামেনি প্রতিশোধের আগুন।
আইনের বিচার চলার আগেই বাদাঘাট বাজার ও গড়কাটি গ্রামে শুরু হয় অন্য এক বিচার জনতার বিচার। সেই বিচারে অভিযুক্ত নয়, কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় একটি পুরো সম্প্রদায়কে। হামলা হয় মন্দিরে, ভাঙচুর করা হয় প্রতিমা, লুটপাট করা হয় ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াতে হয় নিরীহ মানুষকে।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র যখন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে, তখন এই হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল?
বিচার চাই, প্রতিশোধ নয়
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা কোনো সভ্য সমাজেই গ্রহণযোগ্য নয়। মুসলমানদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য যেমন নিন্দনীয়, তেমনি সেই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় অন্য ধর্মের উপাসনালয় ধ্বংস করাও সমানভাবে অন্যায় ও অপরাধ।
কারণ ন্যায়বিচার কখনো প্রতিশোধের সমার্থক নয়।
একজন ব্যক্তি অপরাধ করলে তার দায় ব্যক্তি বহন করবে। তার প্রতিবেশী, তার আত্মীয়, তার সম্প্রদায় বা তার ধর্ম নয়।
এই মৌলিক নীতিটিই যেন বারবার ভুলে যাচ্ছে আমাদের সমাজের একাংশ।
পুরোনো ক্ষত আবারও উন্মুক্ত
বাংলাদেশের ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রায় প্রতিটি ঘটনার পেছনে দেখা যায় একটি অভিন্ন চিত্র। কোনো একটি পোস্ট, গুজব, স্ক্রিনশট কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি উসকানিমূলক কনটেন্টকে কেন্দ্র করে প্রথমে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এরপর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়।
তাহিরপুরের ঘটনাও সেই পরিচিত ধারার পুনরাবৃত্তি।
প্রশ্ন হলো, কেন প্রতিবার একই চিত্র ফিরে আসে?
কারা জনতাকে সংগঠিত করে?
কারা উত্তেজনাকে সহিংসতায় রূপ দেয়?
কারা সুযোগ নিয়ে লুটপাটে অংশ নেয়?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
হামলার আড়ালে কারা?
স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হওয়ার পরও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা হয়েছে।এটি কেবল স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ ছিল এমন ব্যাখ্যা অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয় না।
কারণ একটি মন্দিরে ঢুকে প্রতিমা ভাঙা, তালা ভেঙে মূল্যবান সামগ্রী সরিয়ে নেওয়া, দোকানপাটে হামলা চালানো কিংবা ঘরের পানির ট্যাংকি পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়া কোনো আকস্মিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং সেখানে পরিকল্পনা, সংগঠন এবং সুযোগসন্ধানী অপরাধের উপাদান স্পষ্ট। সুতরাং তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু ফেসবুক পোস্ট নয়, হামলার নেপথ্যের উসকানিদাতারাও থাকা উচিত।
রাষ্ট্রের জন্য পরীক্ষা
তাহিরপুরের ঘটনা এখন রাষ্ট্রের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
অভিযুক্ত তরুণের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বিচার চলবে। কিন্তু একইসঙ্গে যারা মন্দিরে হামলা করেছে, প্রতিমা ভেঙেছে, বাড়িঘরে লুটপাট চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও যদি সমান দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে আইনের শাসনের বার্তা দুর্বল হয়ে পড়বে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা নয়; নিরীহ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও। আইন যদি সবার জন্য সমান না হয়, তাহলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের আস্থা ক্ষয়ে যায়।
সম্প্রীতির বাংলায় এই প্রশ্নের উত্তর চাই
বাংলাদেশের শক্তি তার বহুত্ববাদ, সহাবস্থান ও সম্প্রীতির ঐতিহ্যে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ভূখণ্ডে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে এসেছে।
তাই একজনের অপরাধের দায় পুরো সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শুধু অন্যায় নয়; এটি বাংলাদেশের চেতনারও পরিপন্থী।
তাহিরপুরের ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরের ভাঙা প্রতিমা, লুট হওয়া দোকান, আতঙ্কে ঘরছাড়া পরিবারগুলো আজ রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে একই প্রশ্ন রাখছে
যদি অপরাধী গ্রেপ্তার হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের অপরাধ কী ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু প্রশাসনের কাছে নয়, আমাদের সামষ্টিক বিবেকের কাছেও ঋণ হয়ে রইল। কারণ বিচারহীনতা যেমন অপরাধ জন্ম দেয়, তেমনি নীরবতা জন্ম দেয় নতুন সহিংসতার।
আর একটি সভ্য রাষ্ট্রে কোনো নাগরিকের নিরাপত্তা তার ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না।
প্রধান উপদেষ্টা :সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ মনিরুজ্জামান, উপদেষ্টা :এস এম আজিজুর রহমান স্বপন, প্রধান প্রকাশক ও সম্পাদক : শেখ শাহীন, সহযোগি সম্পাদক : মোসা: শেখ মাজেদা, নির্বাহী সম্পাদক : ফাতেমা বেগম, সম্পাদক শেখ জান্নাতুল ফেরদাউস,সম্পাদক : শেখ শারফিয়া মরিয়ম,সম্পাদক এ্যাড:ফারুক হোসেন,প্রকাশক ও প্রধান বার্তা সম্পাদক :জাহারুল ইসলাম জীবন, বার্তা সম্পাদক - আশিষ সাহা, বার্তা সম্পাদক অমিত তালুকদার,বার্তা সম্পাদক গাজী মনিরুজ্জামান মনি,প্রবাসী সম্পাদক :মোঃ সেলিম রানা,হেড অফ মার্কেটিং মোঃ মামুন মোল্লা,অফিস সম্পাদক মোঃ রোমেল হোসেন।
অফিস ঠিকানা:কর্পোরেট অফিস :৫৫/বি নোয়াখালী টাওয়ার লিফটের ১৬ রুম নং ১৬/২ ঢাকা-১০০০ আঞ্চলিক অফিস :ডাকবাংলা মোড় আকাঙ্ক্ষা টাওয়ার লিফটের ৫ রুম নং ৫/বি২ খুলনা মোবাইল নাম্বার: অফিস 01911223672, প্রধান প্রকাশক ও সম্পাদক 01811441416, বার্তা সম্পাদক-01974580945
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক ঢাকার সময় । Website: www.thedhakersomoy.com