যাদুকাটায় ‘ওপেন সিক্রেট’ চাঁদাবাজি: প্রশাসন নীরব, শ্রমিক নিঃস্ব
অমিত তালুকদার, সুনামগঞ্জ ।
সুনামগঞ্জে চাঁদাবাজির গল্প শুরু হলেই এক নদীর নাম নিঃশব্দে উঠে আসে সেটি হচ্ছে জাদুকাটা। একদিন এই নদী ছিলো জীবনের গান, ছিলো শ্রমিকের ভরসার ঠিকানা। এখানেই ঘাম ঝরিয়ে মানুষ বদলেছে ভাগ্য, হাসিতে ভরেছে ঘর। আজ সেই নদীই যেন অন্য এক জাদুর খেলা দেখাচ্ছে! যেখানে শ্রমিকের কপাল বদলায় না, বদলে যায় চাঁদাবাজদের জীবন।নদীর গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অদৃশ্য চক্র প্রতিদিন একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে পরিশ্রম, পারিশ্রমিক আর স্বপ্ন।এক লহমায় নয় চারটি ধাপে, চারটি নামে—রয়েলিটি, বিআইডব্লিউটিএ, খাস কালেকশন, টুল ট্যাক্স—এই পথ পেরোতেই নিঃশেষ হয়ে যায় জীবনের হিসাব।
বিআইডব্লিউটিএ নিয়ে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসছে বিভিন্ন প্রতিবেদন। বিষয় একটাই অতিরিক্ত টাকা আদায়। বিআইডব্লিউটিএ তে ২৫ পয়সা করে ট্যাক্স আদায়ের কথা। কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা নৌ সংগঠন, নৌশ্রমিকদের অভিযোগ ২৫ পয়সা নয় বরং ১ টাকা ৫০ পয়সা দিতে হয়। যদিও ইজারাদার বিষয়টি অস্বীকার করেন, তবুও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায় অনুসন্ধানে। গত ১০ ই মার্চ উপজেলা প্রশাসন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় রঙ্গিয়ার চর এলাকায় আবুয়া ও রক্তি নদীর সংযোগস্থলে (BIWTA কর্তৃক ইজারাকৃত) টোল আদায় এর ক্ষেত্রে ২৫ পয়সার স্থলে ১.৫০ টাকা করে আদায় করায় এবং আদায়ের রশিদ প্রদান না করায় ০১ (এক) জনকে ০১ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেন। এসময়, টোল এর জায়গায় টোলের চার্টসহ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ওসি, বিশ্বম্ভরপুর এর মোবাইল নম্বর দৃশ্যমান জায়গায় টানানোর জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়।
“২৫ পয়সার টোল ১.৫০ টাকা দিতেছি। টাকা না দিলে নৌকা আটকে রাখে, অনেক সময় মারধরও করে। আমরা কাজ করবো না চাঁদা দেবো এইটাই এখন প্রশ্ন।” (এক নৌশ্রমিক)
একদিনের অভিযানে চাঁদাবাজির প্রমাণ মিললেও অনুসন্ধানে জানা যায়, দৈনন্দিনই চলছে এই চাঁদাবাজি। কিছু নৌশ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানায় ২৫ পয়সার সরকারি রেট থাকলেও ১.৫০ টাকার নিচে ইজারাদার কতৃপক্ষ মানতেই চায় না বরং নৌ আটকে রাখে, এমনকি মারধরের স্বীকার হতে হয়। কিছুদিন পূর্বেই সুনামগঞ্জ জেলার ট্রলার বাল্কহেড শ্রমিক ইউনিয়নের এক সদস্যের নৌকা আটকে বাড়তি চাঁদা দাবি করা হয়, বেচারা শ্রমিক চাঁদা না দেওয়ার কারণে নৌকা আটকে রাখা হয় একদিন। পরেরদিন সংগঠনের লোক ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর বিভিন্ন বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে উভয় পক্ষ। শেষমেশ সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে নির্ধারিত চাঁদা রেখে নৌকাটি ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি শুধু একদিন ঘটছে তা নয়, দৈনন্দিন একই জাদুকরী পদ্ধতিতে টাকা রাখার পায়তারা করছে চক্রটি।
(ভুক্তভোগী নৌকা মালিক)
“আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, তবুও আমার নৌকা আটকাইছে। ৩ দিন ধরে ঘাটে বসে আছি, টাকা না দিলে ছাড়বে না—এটা কোনো রাষ্ট্রে হতে পারে?”— মোঃ আবুল হোসেন, নৌকা মালিক
বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট! প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কার্যকরী স্থায়ী পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। গত ৪ ই এপ্রিলও দেখা যায় একই চিত্র,
প্রতিবেদকের কাছে মুঠোফোনে কল আসে, অপর প্রান্ত থেকে কলটি করেন, মোঃআবুল হোসেন উনি থাকেন জামালগঞ্জ। কল করে বলেন ৩ তারিখ রাত্রি থেকেই উনার নৌকা আটক ফাজিলপুর ঘাটে চাহিদা মোতাবেক চাঁদা না দিলে নৌকাটি তারা ছাড়বেন না! তিনি বলেন উনার মাঝির কাছে বিআইডব্লিউটিএ দাবি করেছে ১.৫০ টাকা, খাস কালেকশন ১ টাকা এবং টুলট্যাক্স ১.৫০ টাকা। এমনকি উনি বলেন আমি একজন মুক্তিযুদ্ধার সন্তান আমার নৌকা আটক করে তারা চাদা দাবি করবে তা আমি কখনই মানবো না! আমি বিষয়টি তাহিরপুরের ইউএনও মহোদয়কে জানিয়েছি, সংসদ সদস্য সুনামগঞ্জ -১ কামরুজ্জামান কামরুল ভাইকেও জানিয়েছি তারা লোক পাঠাচ্ছেন। কিন্তু তবুও সমস্যার সমাধান মেলেনি তারপর সাংবাদিকদের আসতে বলেন। এমন ঘটনার বিবরণ দেওয়ার পর পরদিন সরজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা যায়, ফাজিলপুরে বিআইডব্লিউটিএ রাখতে প্রথমে তারা গড়িমসি করলেও কিছুক্ষণ পর ইজারাদার কৃতপক্ষ সুমন নামের ছেলেটি নৌকার নাম এন্ট্রি করে রঙ্গিয়ারচর আরেকজনকে কল দিয়ে বলে দেয় মুক্তিযুদ্ধার নৌকাটা ২০০০ রাইখো।"
এছাড়াও সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর ফাজিলপুর নৌকাঘাট ও সংলগ্ন পাঠানপাড়া খাস কালেকশন পয়েন্টে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অবৈধ টোল আদায় ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। এতে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নৌযান শ্রমিকরা।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সরকার নির্ধারিত প্রতি ঘনফুটে ৩০ পয়সা টোলের পরিবর্তে ১ থেকে ১.৫ টাকা পর্যন্ত অবৈধভাবে আদায় করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। একই স্থানে দুটি আলাদা নামে (নৌকা ঘাট টোল ও খাস কালেকশন) ট্যাক্স আদায় করে শ্রমিকদের ওপর দ্বিগুণ আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অভিযোগে অভিযুক্ত হিসেবে নাম এসেছে,
জবা মিয়া (ইজারাদার),মোঃ জাকেরীন এছাড়াও তাদের সঙ্গে ১০-১৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নৌযান শ্রমিকদের দাবি, কোনো সরকারি রশিদ প্রদান করা হয় না
মূল্য তালিকা প্রদর্শন করা হয়নি। রশিদ ছাড়া টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নৌকা আটকে রাখা হয়। শ্রমিকদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। একাধিক শ্রমিক জানান, বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিতে হচ্ছে, না দিলে নদী পথে চলাচল বন্ধ করে দেয়।
তবে এই বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক দুইবার
মাইকিং করে সতর্ক করানো হলেও তেমন কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় নি। উল্টো দিকে মাইকিং করার পর শ্রমিকদের উপর নির্যাতন আরও বেড়ে গেছে এমনটাই দাবি করছেন নৌশ্রমিকরা।
নৌ শ্রমিকদের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজি প্রতিকারের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর ফাজিলপুর নৌকা ঘাট টোল ট্যাক্স এবং একই স্থানে পাঠানপাড়া খাস কালেকশনের নামে নিয়ম বহির্ভূত ভাবে অতিরিক্ত চাঁদা আদায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয় গত ৩০ই মার্চ কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয় নি।
অন্যদিকে সুনামগঞ্জ -১ আসনের সংসদ সদস্য জনাব কামরুজ্জামান কামরুল গণমাধ্যমকে এই বিষয়ে জানান, প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া এই ধরনে চাঁদাবাজি কখনও সম্ভব নয় উনার এমনটিই মনে হয় প্রশাসন কোনো না কোনো ভাবে এটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হুশিয়ারি থাকলেও বাস্তবে তা প্রতিফলিত হচ্ছে না। যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে আলোচনা আর সমালোচনা।
(সংসদ সদস্যের মন্তব্য)
“প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের চাঁদাবাজি সম্ভব নয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।”
— কামরুজ্জামান কামরুল, সংসদ সদস্য
এই অনিয়মের কারণে নৌযান শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। শ্রমিক সংগঠনের নেতারা সতর্ক করে জানিয়েছেন, দ্রুত সমাধান না হলে যে কোনো সময় নৌ-ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হতে পারে, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাথর ও বালু পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
(শ্রমিক সংগঠনের সতর্কবার্তা)
“এই চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে আমরা নৌ-ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হবো। তখন দেশের পাথর ও বালু পরিবহন বন্ধ হয়ে যাবে।”— নৌশ্রমিক নেতা
সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদীর ফাজিলপুর নৌকাঘাটকে ঘিরে যে অভিযোগ উঠেছে, একই ঘাটে দ্বৈত শৃঙ্খল, টোলের নামে চাঁদাবাজি, রশিদহীন অন্ধকার লেনদেন,রাষ্ট্রের রাজস্ব যেখানে হারিয়ে যায়, অন্যায়ের গহ্বরে। শ্রমিকের ঘামে ভেজা নৌকা থেমে যায় জোরের দেয়ালে,অধিকার চেপে ধরে ভয় আর নদী দেখে, নীরব সাক্ষী হয়ে।সুসংগঠিত এই চাঁদাবাজি রশিদবিহীন অর্থ সংগ্রহ শুধু অনৈতিকই নয়, এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থার পরিপন্থী। যাদুকাটা নদী কোনো চাঁদাবাজির করিডোর নয়, এটি দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবাহপথ। এই প্রবাহকে স্বচ্ছ ও নিরাপদ রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি আর গ্রহণযোগ্য নয়। যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এটি শুধু শ্রমিক অসন্তোষ নয়, বরং একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলা সংকটে রূপ নিতে পারে।
(প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ)
“একই ঘাটে দ্বৈত টোল, রশিদবিহীন আদায় এবং নৌকা আটকে চাঁদা আদায়—সব মিলিয়ে যাদুকাটা এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ চাঁদাবাজির করিডোর।”
প্রধান উপদেষ্টা :সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ মনিরুজ্জামান, উপদেষ্টা :এস এম আজিজুর রহমান স্বপন, প্রধান প্রকাশক ও সম্পাদক : শেখ শাহীন, সহযোগি সম্পাদক : মোসা: শেখ মাজেদা, নির্বাহী সম্পাদক : ফাতেমা বেগম, সম্পাদক শেখ জান্নাতুল ফেরদাউস,সম্পাদক : শেখ শারফিয়া মরিয়ম,সম্পাদক এ্যাড:ফারুক হোসেন,প্রকাশক ও প্রধান বার্তা সম্পাদক :জাহারুল ইসলাম জীবন, বার্তা সম্পাদক - আশিষ সাহা, বার্তা সম্পাদক অমিত তালুকদার,বার্তা সম্পাদক গাজী মনিরুজ্জামান মনি,প্রবাসী সম্পাদক :মোঃ সেলিম রানা,হেড অফ মার্কেটিং মোঃ মামুন মোল্লা,অফিস সম্পাদক মোঃ রোমেল হোসেন।
অফিস ঠিকানা:কর্পোরেট অফিস :৫৫/বি নোয়াখালী টাওয়ার লিফটের ১৬ রুম নং ১৬/২ ঢাকা-১০০০ আঞ্চলিক অফিস :ডাকবাংলা মোড় আকাঙ্ক্ষা টাওয়ার লিফটের ৫ রুম নং ৫/বি২ খুলনা মোবাইল নাম্বার: অফিস 01911223672, প্রধান প্রকাশক ও সম্পাদক 01811441416, বার্তা সম্পাদক-01974580945
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক ঢাকার সময় । Website: www.thedhakersomoy.com