১৬ লাখ থেকে ২২ লাখ! তদন্ত কমিটি গঠনের পরও অভিযুক্তের ডিউটি—কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে জবাবদিহি কোথায়?
রাজস্ব গরমিলের অভিযোগে তদন্ত, এক বছরের রেজিস্টার নিখোঁজ; সরকারি অর্থের হিসাব নিয়ে তীব্র প্রশ্ন
ষ্ট্যাফ রিপোর্টার
কেঁচো খুঁড়তেই যেন বেরিয়ে আসছে আরও বড় হিসাব। কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগের অনুসন্ধান যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে গরমিলের অঙ্ক। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৬ লাখ টাকা গরমিলের অভিযোগ উঠলেও তদন্তে সেই অঙ্ক বেড়ে প্রায় ২২ লাখ টাকা হয়েছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে।
এর সঙ্গে জরুরি বিভাগের এক বছরের গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্টার খাতা না পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় পুরো ঘটনা ঘিরে তৈরি হয়েছে আরও গুরুতর প্রশ্ন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, অভিযোগের তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠনের পরও অভিযুক্ত সিনিয়র নার্স উদয় শংকর পাল দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রশ্ন উঠছে, সরকারি রাজস্বের বড় অঙ্কের গরমিলের অভিযোগে যার দায়িত্বকাল তদন্তের আওতায়, তদন্ত চলাকালে তাকেই একই ধরনের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া কতটা যৌক্তিক?
১৬ লাখের অভিযোগ, তদন্তে ২২ লাখের গরমিল!
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সাল থেকে প্রায় তিন বছর জরুরি বিভাগের নার্স ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন উদয় শংকর পাল। ওই সময়ে জরুরি বিভাগের টিকিট, ওটি চার্জ, কেবিন ভাড়াসহ বিভিন্ন খাতের রাজস্ব আদায় ও হিসাব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ছিল।
প্রাথমিক অভিযোগে প্রায় ১৬ লাখ টাকা সরকারি রাজস্বের গরমিল বা আত্মসাতের কথা বলা হলেও তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে অর্থের অঙ্ক প্রায় ২২ লাখ টাকায় পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলা যাচ্ছে না। নথিপত্র, হিসাব এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাইয়ের পরই প্রকৃত দায় নির্ধারণ সম্ভব।
এক বছরের রেজিস্টার উধাও, উঠছে নথি গায়েবের প্রশ্ন
তদন্তে জরুরি বিভাগের একটি বছরের রেজিস্টার খাতা পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, মূল রেজিস্টারের পরিবর্তে নতুন রেজিস্টার ব্যবহারের মাধ্যমে হিসাব সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছিল।
যদি সরকারি রাজস্ব আদায়-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্টার সত্যিই নিখোঁজ হয়ে থাকে, তাহলে সেটি নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি নাকি হিসাব গোপন বা বিকৃত করার কোনো প্রচেষ্টা, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৯ ধারা প্রযোজ্য কি না, সেটিও তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে বিবেচনা করতে হবে। সরকারি কর্মচারী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির দ্বারা বিশ্বাসভঙ্গ করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে এই ধারার বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
একই সঙ্গে হিসাবের নথি ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন, পরিবর্তন বা জাল করার প্রমাণ পাওয়া গেলে দণ্ডবিধির ৪৬৬, ৪৬৭, ৪৬৮ বা ৪৭১ ধারার প্রাসঙ্গিকতা তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে তদন্তে প্রাপ্ত প্রমাণ ও ঘটনার প্রকৃতির ওপর।
তদন্ত কমিটি আছে, অভিযুক্তের ডিউটিও আছে!
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তিন সদস্যের অডিট/তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অথচ তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় অভিযুক্ত সিনিয়র নার্স কীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন, তা নিয়ে হাসপাতালসংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তদন্ত প্রভাবমুক্ত রাখতে অভিযুক্ত ব্যক্তির দায়িত্ব পরিবর্তন, নথিতে প্রবেশাধিকার সীমিত করা কিংবা প্রশাসনিকভাবে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল কি না, সেটিও এখন আলোচনায়।
সদর হাসপাতালের নার্স ইনচার্জ মোয়াজ্জেন হোসেন বলেন, “এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। দোষী হলে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আসবে।”
তবে অভিযুক্ত সিনিয়র নার্স কীভাবে তদন্ত চলাকালীন দায়িত্ব পালন করছেন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স ইনচার্জ কোনো উত্তর দেননি।
আরও কারা জড়িত, উঠছে সেই প্রশ্নও
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের প্রধান সহকারী শরীফুল ইসলাম বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনে উদয় শংকর পালকে সহায়তা করতেন। তাঁর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন খাতে অনিয়মিত বা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থের গরমিলের অভিযোগ রয়েছে বলে কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেছেন।
তিনি সম্প্রতি অন্যত্র বদলি হলেও তাঁর দায়িত্বকালীন আর্থিক লেনদেনও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিললে দায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
টাকা ফেরত দিলেই কি দায় শেষ?
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. নূর মো. শামসুল আলম জানিয়েছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সরকারি অর্থ ফেরত নেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়ার প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন—সরকারি অর্থের গরমিল প্রমাণিত হলে শুধু টাকা ফেরত নিলেই কি রাষ্ট্রের ক্ষতির দায় শেষ হয়ে যাবে?
সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রমাণিত হলে অর্থ ফেরত নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে। সরকারি অর্থের ক্ষেত্রে সরকারি অর্থ ও সম্পত্তি আত্মসাৎ, বিশ্বাসভঙ্গ, জালিয়াতি বা নথি বিকৃতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে ফৌজদারি দায়ও সৃষ্টি হতে পারে।
এ ছাড়া দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর আওতায় বিষয়টি অনুসন্ধান বা তদন্তের প্রয়োজনীয়তাও তৈরি হতে পারে।
শুধু রেজিস্টার নয়, চাই পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট
হাসপাতালসংশ্লিষ্টদের মতে, একটি রেজিস্টারের ওপর নির্ভর করে তদন্ত করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে নাও আসতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সময়ের—
জরুরি বিভাগের সব টিকিট,
ওটি চার্জ,
কেবিন ভাড়া,
রোগী ভর্তি ও ছাড়পত্রের তথ্য,
রসিদ ও ভাউচার,
ব্যাংক হিসাব,
সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া চালান,
দৈনিক আদায় ও জমার হিসাব,
রেজিস্টার ও বিকল্প রেজিস্টার
পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
একই সঙ্গে নিখোঁজ রেজিস্টারটি কোথায় গেল, কার হেফাজতে ছিল, কখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না এবং কেন বিকল্প রেজিস্টার ব্যবহার করা হলো—এসব প্রশ্নেরও সুনির্দিষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে প্রশ্ন থেকেই যাবে
সরকারি হাসপাতালে প্রায় ২২ লাখ টাকার কথিত রাজস্ব গরমিল, এক বছরের রেজিস্টার নিখোঁজ এবং তদন্ত কমিটি গঠনের পরও অভিযুক্ত ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের অভিযোগ কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। তদন্তে যদি অর্থ আত্মসাত, হিসাব জালিয়াতি, নথি গোপন বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের দায় নির্ধারণ করে প্রশাসনিক ও ফৌজদারি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এখন মূল প্রশ্ন তিনটি—
২২ লাখ টাকার কথিত গরমিলের প্রকৃত হিসাব কোথায়?
নিখোঁজ এক বছরের রেজিস্টার গেল কোথায়?
আর তদন্ত চলাকালীন অভিযুক্ত ব্যক্তি কীভাবে একই ধরনের দায়িত্ব পালন করছেন?
এই তিন প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর এবং তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনই বলে দেবে, কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে এটি নিছক হিসাবের গরমিল, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কোনো অনিয়মের চিত্র।
প্রধান উপদেষ্টা :সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ মনিরুজ্জামান, উপদেষ্টা :এস এম আজিজুর রহমান স্বপন, প্রধান প্রকাশক ও সম্পাদক : শেখ শাহীন, সহযোগি সম্পাদক : মোসা: শেখ মাজেদা, নির্বাহী সম্পাদক : ফাতেমা বেগম, সম্পাদক শেখ জান্নাতুল ফেরদাউস,সম্পাদক : শেখ শারফিয়া মরিয়ম,সম্পাদক এ্যাড:ফারুক হোসেন,প্রকাশক ও প্রধান বার্তা সম্পাদক :জাহারুল ইসলাম জীবন, বার্তা সম্পাদক - আশিষ সাহা, বার্তা সম্পাদক অমিত তালুকদার,বার্তা সম্পাদক গাজী মনিরুজ্জামান মনি,প্রবাসী সম্পাদক :মোঃ সেলিম রানা,হেড অফ মার্কেটিং মোঃ মামুন মোল্লা,অফিস সম্পাদক মোঃ রোমেল হোসেন।
অফিস ঠিকানা:কর্পোরেট অফিস :৫৫/বি নোয়াখালী টাওয়ার লিফটের ১৬ রুম নং ১৬/২ ঢাকা-১০০০ আঞ্চলিক অফিস :ডাকবাংলা মোড় আকাঙ্ক্ষা টাওয়ার লিফটের ৫ রুম নং ৫/বি২ খুলনা মোবাইল নাম্বার: অফিস 01911223672, প্রধান প্রকাশক ও সম্পাদক 01811441416, বার্তা সম্পাদক-01974580945
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ দৈনিক ঢাকার সময় । Website: www.thedhakersomoy.com