সংঘাত: অপরাধী বনাম পরিবেশ, পরিবেশ বনাম প্রশাসন
বার্তা সম্পাদকঃ অমিত তালুকদার
বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট, জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর— আজ অস্তিত্ব সংকটে। এছাড়াও যাদুকাটা, শিমুলবাগানসহ আশপাশের গ্রাম গুলোর অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। অবৈধ শিকারি, বালু মাফিয়া আর নদীখেকোদের দৌরাত্ম্যে । কিন্তু প্রশাসন চাইলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। অবৈধ জাল, বালু লুট আর পাড়কাটায় পরিবেশ ধ্বংস—তাহিরপুর উপজেলা প্রশাসনের কাছেও নেই পর্যাপ্ত লজিস্টিক।
জীববৈচিত্র্যের মৃত্যু যাত্রা কারেন্ট জাল দিয়ে প্রতিদিন অবাধে মাছ শিকার চলছে হাওরের বিভিন্ন খালে-বিলে।
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, এসব জাল এত সূক্ষ্ম যে ডিম, পোনা, ব্যাঙাচি এমনকি ছোট চিংড়িও রেহাই পাচ্ছে না।
ফলে মাছের প্রজনন চক্র ভেঙে পড়ছে— হারিয়ে যাচ্ছে বিলুপ্তপ্রায় স্থানীয় প্রজাতি যেমন মৃগেল, বোয়াল, টেংরা, শোল।
পরিবেশবিদদের মতে, “কারেন্ট জাল শুধু মাছ নয়, পুরো খাদ্যচক্রকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মাছ কমে গেলে পাখি আসে না, জলজ প্রাণী মরে যায়, পানির মানও নষ্ট হয়।”
ফলে পুরো ইকোসিস্টেম বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।
প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা— নেই যাতায়াতের উপকরণ তাহিরপুর উপজেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরুখ আলম শান্তনু বলেন,
“অভিযান চালাতে গেলে সবচেয়ে বড় বাধা যাতায়াত। হাওর, যাদুকাটা নদী কিংবা বারেকটিলায় পৌঁছাতে স্পিডবোট ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু আমাদের নিজস্ব কোনো লজিস্টিক না থাকায় ভাড়াটে বোট নিতে হয়, অনেক সময় নিজের বেতন থেকে টাকা দিতে হয়।”
তিনি আরও জানান, বেশিরভাগ অপরাধই ঘটে নদীপথে, বিশেষ করে গভীর রাতে।“রাতে ভাড়াটে বোট পাওয়া যায় না, ফলে অবৈধ জাল ফেলা, বালু উত্তোলন বা পাড় কাটা ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।”
নদীর পাড়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় নদীর আয়তন ক্রমেই কমছে, গভীরতাও হ্রাস পাচ্ছে। আগে নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় ৫৭ ফুট, এখন কিছু স্থানে তা এক কিলোমিটারেরও বেশি হয়ে গেছে— অর্থাৎ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ভেঙে পড়েছে। “যাদুকাটা নদীকে রক্ষা করতে পাড়কাটা বন্ধ করে নদীর দুই তীর সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করতে হবে— এখনই সময়।”
জীবিকা হারাচ্ছে প্রকৃত জেলেরা কারেন্ট জালে মাছ কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত জেলেরা। স্থানীয় মৎস্যজীবী আলী হোসেন বলেন, “আগে প্রতিদিন পাঁচ-ছয় কেজি মাছ পেতাম, এখন এক কেজিও পাই না। জাল ফেললে শুধু কচুরিপানা উঠে আসে।”
ফলে হাওরনির্ভর প্রায় হাজারো পরিবার জীবিকা হারিয়ে বিকল্প পেশায় ঝুঁকছে।
দুটি স্পিডবোটই হতে পারে বড় সমাধান। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপজেলা প্রশাসনের হাতে মাত্র দুটি সরকারি স্পিডবোট থাকলে নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হতো। তাহলে অবৈধ বালু উত্তোলন, কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরা ও রাতের চোরাচালান— সবকিছুই নিয়ন্ত্রণে আসত।
“প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়। দুটি স্পিডবোটের অভাবে এমন অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস হতে দেওয়া দুঃখজনক। প্রশাসনকে অবিলম্বে সরকারি স্পিডবোট সরবরাহ করা জরুরি হয়ে দাড়িয়েছে।
টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু সুনামগঞ্জ নয়, পুরো বাংলাদেশের গর্ব। বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু প্রকৃতির নয়, পর্যটনেরও অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের স্থায়ী কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় থামছে না যাদুকাটা নদীর ভয়াবহ পাড়কাটা— হুমকিতে সীমান্ত এলাকা। প্রায় দুই দশক ধরে যাদুকাটা নদীর পাড় কাটা অব্যাহত রয়েছে।
একজন স্থানীয় শিক্ষক বলেন,
“হাওরের প্রাণ বাঁচাতে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। দুটি স্পিডবোট হয়তো ছোট চাহিদা, কিন্তু সেটিই হতে পারে টাঙ্গুয়ার হাওরের বাঁচার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।”
প্রশাসনের হাতে পর্যাপ্ত লজিস্টিক (যেমন স্পিডবোট, জনবল, ফান্ড) নেই। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বা দুর্নীতির কারণে আইন প্রয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। পরিবেশ সুরক্ষা কার্যক্রমে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি বা আন্তঃদপ্তর সমন্বয় নেই। এটি বোঝায়— সমস্যার শিকড় শুধু অপরাধীদের নয়, প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতাতেও নিহিত।