আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস: একাত্তরের স্বপ্ন ও আজকের বাংলাদেশ!
প্রধান বার্তা সম্পাদক ও প্রকাশক- জাহারুল ইসলাম জীবন এর বিশেষ নিউজ প্রতিবেদন।
১৪ই ডিসেম্বর- ২০২৫,
আজ ১৪ই ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ঠিক আগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা (আল-বদর, আল-শামস, রাজাকার) যে নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল, তা ছিল সদ্য স্বাধীন হতে যাওয়া বাংলাদেশকে মেধা ও মননশূন্য করার এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সেই সূর্যসন্তানদের, যাঁরা তাঁদের প্রজ্ঞা, লেখনী ও কর্মের মাধ্যমে জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগ আজও আমাদের পথ চলার প্রেরণা।
এই শোকের দিনে দাঁড়িয়ে, একাত্তরের সেই আত্মদানের আকাঙ্ক্ষা আর স্বাধীন বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র- এই দুইয়ের তুলনামূলক আলোচনা আজ সময়ের দাবি।
১. স্বাধীনতার মূল দাবী ও আজকের প্রেক্ষাপট:- মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র ছিল দেশের মাটি ও মানুষের ন্যায্য অধিকার ও দাবী, প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, এবং খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্ধশতকেও বেশি সময়ে দেশের অর্জন ও চ্যালেঞ্জগুলো পর্যালোচনা করা সময়ের দাবিতে অতীব জরুরি:
** মৌলিক অধিকার:-
* অর্জন:- বাংলাদেশ একসময়ের "তলাবিহীন ঝুড়ি" অপবাদ ঘুচিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেছে। দারিদ্র্যের হার অনেক কমেছে, শিক্ষায় এনরোলমেন্ট বেড়েছে, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি হওয়ায় শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে এবং গড় আয়ু বেড়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এবং কৃষিতে সাফল্য দেশের অর্থনীতিকে মজবুত করেছে।
* চ্যালেঞ্জ:- এখনো একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ গুণগত শিক্ষা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা, এবং নিশ্চিত বাসস্থান থেকে বঞ্চিত। অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পাওয়ায় মৌলিক অধিকারের সুযোগগুলো সকলের জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
** আইনের শাসন ও গণ-অধিকার:-
* আকাঙ্ক্ষা:- শহীদ বুদ্ধিজীবীরা এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে আইনের চোখে সবাই সমান এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষিত।
* বর্তমান চিত্র:- আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন, এবং মানবাধিকার সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিতর্ক ও সমালোচনা প্রায়শই দেখা যায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন নিয়েও বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ রয়েছে।
২. দেশের উন্নয়নে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা:- স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সরকারই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য বিভিন্ন ভূমিকা রেখেছেন।
** বঙ্গবন্ধু ও প্রথম সরকার (১৯৭২-৭৫):- যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, সংবিধান রচনা, এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
** পরবর্তী সরকারসমূহ (জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া):- অর্থনীতিকে উন্মুক্তকরণ, বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা, এবং অবকাঠামো উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশ, গ্রামীণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এই সময়ের অন্যতম অর্জন।
** আওয়ামী লীগ সরকার (বিশেষত ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২৪):- দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প (যেমন পদ্মা সেতু) বাস্তবায়ন, এবং মানব উন্নয়ন সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এই সময়ের প্রধান অর্জন।
** অন্তর্বর্তী সরকার (২০২৪-বর্তমান):- সদ্য গঠিত এই সরকার একটি বহুল আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের পথে দেশকে পরিচালনা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
দলীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক থাকলেও, সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি সাহায্য-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে বাণিজ্য-নির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
৩. সুশাসনের সংকট ও অর্থনৈতিক মুক্তি:- সুশাসন, দুর্নীতি দমন ও অর্থনৈতিক মুক্তি একটি অন্যটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
** দুর্নীতি ও অর্থ পাচার:- বিভিন্ন সময় ক্ষমতা ও প্রভাবশালীদের দুর্নীতির চিত্র, ঘুষ বাণিজ্য, অর্থ পাচার এবং অর্থ আত্মসাৎ দেশের অর্থনীতি ও সুশাসনের প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কতিপয় কর্মকর্তার বিতর্কিত ভূমিকা এবং জবাবদিহিতার অভাব এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
** আইন প্রয়োগকারী সংস্থা:- আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের দক্ষতা বৃদ্ধি পেলেও, তাদের নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার বিষয়ে প্রায়শই প্রশ্ন ওঠে। সুশাসনের অভাব দেশের আইনের উপর জনগণের আস্থাকে দুর্বল করে।
** অর্থনৈতিক মুক্তি:- অর্থনীতি এগিয়ে চললেও, পুঁজি পাচার, খেলাপি ঋণ ও আর্থিক খাতে সুশাসনের ঘাটতি অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বড় বাধা। এসব কারণে দেশের ভেতর বিনিয়োগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়ে।
৪. বর্তমান আইনের ক্রাইসিস ও রাজনৈতিক শূন্যতা:- সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন দেশে এক নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।
** আইনের ক্রাইসিস: রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, আইনের অপব্যবহার এবং ন্যায়বিচার পেতে বিলম্ব- এই বিষয়গুলো আইনের ক্রাইসিসকে নির্দেশ করে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
** রাজনৈতিক শূন্যতা ও অস্থিরতা:- দীর্ঘদিনের একদলীয় আধিপত্যের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা দেশে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের দুর্বলতা এই শূন্যতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। তবে, এই পটপরিবর্তন জনগণের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র ও একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার এক নতুন সুযোগও তৈরি করেছে।
৫. দেশের আগামীর ভবিষ্যৎ:- কোন পথের সন্ধানে?
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের আগামীর ভবিষ্যৎ দুটি প্রধান পথের সন্ধানে রয়েছে:
১. গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার পথ:- যদি দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়া একটি অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে স্থায়ী গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রকৃত অর্থে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়, তবেই দেশের ভবিষ্যৎ হবে স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ। এই পথে অর্থনৈতিক মুক্তি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।
২. অনিশ্চয়তা ও স্থবিরতার পথ:- যদি রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য না দিতে পারে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনে ব্যর্থতা আসে, তবে দেশ আরও গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে স্থবির করে দেবে।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়, সে জন্য জাতি আজ সংকল্পবদ্ধ। একাত্তরের বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য একটি মানবিক রাষ্ট্র, যেখানে থাকবে প্রকৃত আইনের শাসন। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্যই আগামী দিনগুলিতে দেশের সকল পক্ষকে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে অতিব জরুরী ভাবে, নিতে হবে সঠিক বাস্তবমূর্খী আধুনিক বিশ্ব সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ডিজিটালাইজড নির্দেশনার সঠিক লাগসই দুর্নীতি মুক্ত সকল মেগা পরিকল্পিত পরিকল্পনা।