২০ কোটি টাকার বেশি সব ঋণ যাচাই হবে : গভর্নর
ইআরএফ আয়োজিত ‘ব্যাংকিং সেক্টর রিফর্ম : চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক সেমিনারে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরসহ অন্যরা
২০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের সব ঋণ যাচাইয়ের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। একই সঙ্গে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান আইনি জটিলতা দ্রুত দূর করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এসব ব্যাংকের নাম ও সাইনবোর্ড আজ-কালের মধ্যেই পরিবর্তন করা হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিকস রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং সেক্টর রিফর্ম : চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গভর্নর।
তিনি বলেন, একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের যেসব শাখা একই এলাকায় রয়েছে, সেখানে একটি শাখা থাকবে। বাকি শাখাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা হবে। আমানতকারীদের সুরক্ষায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক ফেরতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে অপ্রয়োজনে সবাইকে একসঙ্গে টাকা তুলে নেওয়া থেকে বিরত থাকার আহবান জানান তিনি।
গভর্নর বলেন, পৃথিবীর কোনো ব্যাংকই একযোগে সব গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারে না।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভর্নর বলেন, নির্বাচনকালেও অর্থনীতি ধ্বংস হবে না। কারণ বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (বিওপি) ইতিবাচক রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার স্থিতিশীল রেখে ডলার কিনছে।
এরই মধ্যে আড়াই বিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছে এবং আগামী দিনে ৩৪-৩৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। এ কারণে আইএমএফের ঋণ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতির কথা স্বীকার করে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, অনেকেই ব্যাংককে ব্যক্তিগত মালিকানার মতো ব্যবহার করেছেন। এই প্রবণতা বন্ধ করা হবে। বড় ঋণে অনিয়ম হলে শুধু মালিক নন, ব্যাংকের কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদকেও দায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এক হাতে তালি বাজে না।’
গভর্নর জানান, ঝুঁকিভিত্তিক ও ফরেনসিক অডিট আরো জোরদার করা হবে। এরই মধ্যে ১৪টি ব্যাংক পুনর্গঠন এবং পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আরো ব্যাংক পুনর্গঠন করা হবে। তবে ভালো পারফরম্যান্স করলে একীভূত করা হবে না। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক ভালো করায় সেটিকে একীভূত করা হয়নি।
তিনি আরো জানান, একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের জন্য ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এসব ব্যাংকের গ্রাহকরা অর্থ পাবেন। একই সঙ্গে অর্থঋণ আদালতকে কার্যকর করা এবং ইনসলভেন্সি আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আলোচনায় মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের মূল কাজের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে জড়িয়েছে। ক্যাপিটাল মার্কেট কার্যকর না থাকায় ব্যাংকগুলোকে সেই দায়িত্ব নিতে হয়েছে, যার মাধ্যমে শিল্পায়নও হয়েছে। তবে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক দখলের পর থেকেই ব্যাংকিং খাতে মাফিয়াতন্ত্রের সূচনা হয় এবং সেখান থেকেই সংকট ঘনীভূত হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, একসময় ব্যাংকিং খাত উদ্যোক্তা তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নীতিগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ দেওয়ার কারণে খাতটি ধ্বংসের মুখে পড়ে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় বাজেটের সমান বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার ও সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।