সংগৃহীত
হার না মানা সংগ্রামের প্রতীক খালেদা জিয়ার জীবনাবসান
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায় তিনি ইহকাল ত্যাগ করেছেন।
(ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)
তার মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিএনপির প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপসহীনতা, দৃঢ়তা ও সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক। তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জনগণের অধিকারের পক্ষে অবিচল অবস্থান নিয়ে ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন।
১৯৮২ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিয়েই তিনি স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে সামনে আসেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে তাকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন। সে সময় বিএনপি ছিল গভীর সংকটে। দলের নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন।
তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বগুণের কারণে দ্রুতই তিনি দলের শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসেন। ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হন এবং একই বছরের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯৩, ২০০৯ ও ২০১৬ সালের কাউন্সিলে তিনি পুনরায় দলের সর্বোচ্চ দায়িত্ব লাভ করেন।
এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলেন খালেদা জিয়া। কোনো রাজনৈতিক আপস ছাড়াই তিনি ‘এরশাদ হটাও’ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘ এই সংগ্রামের ফলেই ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
১৯৯১ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার এবং ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের চেয়ারপারসন হিসেবেও তিনি দুইবার দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনী রাজনীতিতে তার একটি বিরল রেকর্ড রয়েছে—পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে ২৩টি আসনের প্রতিটিতেই তিনি বিজয়ী হন।
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সেনাসমর্থিত ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ কারাবাসের সময় তাকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি দেশ ছাড়েননি। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তার বিরুদ্ধে মোট ৩৭টি মামলা হয় এবং টানা সাত বছর তাকে কারাবন্দি থাকতে হয়।
২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয়, যেখানে তিনি প্রায় ২৮ বছর বসবাস করেছিলেন। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার ওই বাসভবনটি তার নামে বরাদ্দ দিয়েছিলেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, মামলা ও কারাবাসের মুখোমুখি হয়েও তিনি কখনো আপস করেননি। তার নেতৃত্ব ও দৃঢ়তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাকে হার না মানা সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত করেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে নেমে এসেছে গভীর শোক। তার প্রয়াণে বাংলাদেশ এক সংগ্রামী, সাহসী ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে হারাল।