বিদ্রূপ নয়, পরিচয়! মৌলভীবাজারের মানুষের 'ফগা' হওয়ার নেপথ্য কাহিনী।
মোঃ আব্দুস সালাম স্টাফ রিপোর্টার।
আঞ্চলিকতার টানে বা আড্ডার ছলে মৌলভীবাজারের মানুষকে অনেকেই 'ফগা' বলে সম্বোধন করেন। দীর্ঘকাল ধরে এই শব্দটি একটি নেতিবাচক বা বিদ্রূপাত্মক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে আসলেও, এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এক অনন্য এবং সাহসী ইতিহাস। ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, 'ফগা' হওয়া কোনো বোকামি ছিল না; বরং তা ছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তির গালে এক সজোর চপেটাঘাত।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯১৯ সালে। তখন সমগ্র ভারতজুড়ে ব্রিটিশ বিরোধী 'অসহযোগ আন্দোলন' তুঙ্গে। চতুর ইংরেজ শাসকরা সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আন্দোলন থেকে সরিয়ে নিতে 'আসাম প্রাদেশিক আইন সভা' নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এই নির্বাচন বর্জনের ডাক দিলেও ব্রিটিশদের মদদপুষ্ট 'ন্যাশনাল লিবারাল ফ্রন্ট' নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
মৌলভীবাজার পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান ইরেশ লাল সোম যখন সেই নির্বাচনে প্রার্থী হন, তখন স্থানীয় সচেতন ও শিক্ষিত সমাজ ব্রিটিশদের এই সাজানো নির্বাচনকে ব্যর্থ ও হাস্যকর প্রমাণ করার এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন, কোনো ভদ্রলোক বা উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি এই নির্বাচনে অংশ নেবেন না; বরং সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও নিরক্ষর একজনকে প্রার্থী করে আইন সভায় পাঠানো হবে।
সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, চিরতন মুচিকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো হয়। ১৯১৯ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে নিরক্ষর চিরতন মুচি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে 'আসাম প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য' নির্বাচিত হন। এটি ছিল ব্রিটিশদের তথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি এক চরম অবজ্ঞা এবং বিদ্রূপ।
একজন মুচিকে আইন সভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করার এই ঘটনাটি তৎকালে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। ব্রিটিশপন্থী এবং বিরোধী পক্ষগুলো মৌলভীবাজারের মানুষকে 'ফগা' (সহজ-সরল বা বোকা অর্থে) বলে আখ্যায়িত করতে শুরু করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি বোকামি ছিল না, ছিল সচেতন দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ।
মৌলভীবাজারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তখন সুনামগঞ্জ থেকে কালিচরণ মুচি, নোয়াখালী ও কুমিল্লা অঞ্চল থেকেও নিম্নবর্গের মানুষ ও সাধারণ শ্রমজীবীদের নির্বাচিত করে আইন সভাকে বিশ্ব দরবারে একটি হাস্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রতি এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ব্যক্তি নিজামূল ইসলামের গবেষণা ও প্রচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদারের 'বাংলাদেশের ইতিহাস (আধুনিক যুগ)' গ্রন্থেও এই ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদের উল্লেখ পাওয়া যায়।
মৌলভীবাজারের মানুষ সেদিন চিরতন মুচিকে ভোট দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, দেশপ্রেমের প্রশ্নে তারা আপসহীন। আজ যারা না জেনে 'ফগা' বলে বিদ্রূপ করেন, তাদের জানা উচিত—এটি কোনো অপবাদ নয়, বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক শৈল্পিক ও রাজনৈতিক বিদ্রোহের স্মারক।
মৌলভীবাজারবাসী সেদিন বোকা ছিলেন না, তারা ছিলেন সময়ের চেয়ে অগ্রগামী এক সাহসী সমাজ।