স্টুডিওপাড়ায় রংবদলের পালা: টালিগঞ্জ এবার মুম্বাই-হায়দরাবাদের পথে?*
লুতুব আলি
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত স্পষ্ট। তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাস্ত করে বিজেপি সরকার গঠন করতে চলেছে। এই ভোটের ফলাফলের ঢেউ এসে লাগছে টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায়ও। প্রশ্ন উঠছে, গেরুয়া শিবির ক্ষমতায় এলে টলিউড কি ‘লোকাল’ গণ্ডি ছেড়ে ‘প্যান-ইন্ডিয়া’ হবে? সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, হল-বণ্টন, অনুদানের রং বদলালে কনটেন্টের বাজারও কি বদলাবে? ইন্ডাস্ট্রির গত দশকের ট্রেন্ড আর সাম্প্রতিক পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখা যাক। তৃণমূল আমলে টালিগঞ্জ ছিল কার্যত একরঙা। রাজ চক্রবর্তী, দেব, মিমি চক্রবর্তী, নুসরত জাহান, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সোহম চক্রবর্তী, কাঞ্চন মল্লিক, ব্রাত্য বসু সরাসরি তৃণমূলের সাংসদ, বিধায়ক বা প্রচারমুখ ছিলেন। সরকারি অনুদান, টেলিসিনে অ্যাওয়ার্ড, নন্দন, স্টার থিয়েটার, কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল— সব জায়গায় শাসক-ঘনিষ্ঠদের প্রাধান্য ছিল। অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী জানিয়েছেন, “সরকারের বিরোধিতা করলে সিনেমা হল বা থিয়েটারের জন্য হল না দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে”। অর্থাৎ ক্ষমতার ছাতা না পেলে কাজ পেতে সমস্যা হয়েছে অনেকেরই। এই একচেটিয়া বলয়ের কারণে টালিগঞ্জের কনটেন্টও অনেকটা ‘রাজ্য-কেন্দ্রিক’ থেকে গেছে। দু-একটা ‘গোলন্দাজ’, ‘চেঙ্গিজ’ প্যান-ইন্ডিয়া মুক্তি পেলেও সেটা ব্যক্তি উদ্যোগে, কোনও রাষ্ট্রীয় রোডম্যাপে নয়। ফলে হিন্দি বা দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রির তুলনায় বাংলা কনটেন্টের জাতীয় বাজার ছোটই রয়ে গেছে। বিজেপির জয়ের আভাস মিলতেই ছবিটা পাল্টাতে শুরু করেছে। জিৎ, অঙ্কুশ, যশ দাশগুপ্তের মতো প্রথম সারির নায়করা সমাজমাধ্যমে বিজেপিকে অভিনন্দন জানিয়ে পোস্ট করেছেন। উল্লেখ্য, যশ দাশগুপ্ত এক সময় বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। অঙ্কুশকে এত দিন তৃণমূলের মঞ্চের পরিচিত মুখ হিসেবেই দেখা গেছে। এ বার তৃণমূলের হয়ে প্রচারের রোড শো-তেও ছিলেন তিনি। হাওয়াবদলের ইঙ্গিত এখানেই স্পষ্ট। সোহিনী সরকার বলছেন, “এত দিন নেতামন্ত্রীদের উন্নতি দেখেছি। এ বার যদি সাধারণ মানুষের উন্নতি হয়, সেটাই চাই”। সুদীপ্তা চক্রবর্তীর আশা, “দিনের পর দিন যে অন্যায়গুলো চলছিল, সেটা এ বার বন্ধ হবে”। এই বদলের মধ্যে লুকিয়ে আছে প্যান-ইন্ডিয়া সম্ভাবনা। প্রথমত, কেন্দ্র-রাজ্য এক দল হলে CBFC, NFDC, প্রসার ভারতী, DD বাংলা, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টরেট— সব দরজা একসঙ্গে খুলে যাবে। ‘দ্য কেরালা স্টোরি’, ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’-এর মতো কেন্দ্রীয় ন্যারেটিভের ছবি যে ধরনের প্রমোশন পায়, বাংলা কনটেন্টও সেই নেটওয়ার্ক পেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিজেপি-ঘনিষ্ঠ প্রযোজকরা মুম্বাই-হায়দরাবাদের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে যেতে স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন। ‘প্রজাপতি’ হিন্দিতে ডাব করে মুক্তি দেওয়ার যে সাহস দেব দেখিয়েছেন, সেটা এবার স্টুডিও পলিসি হতে পারে। তৃতীয়ত, ওটিটি-তে জাতীয়তাবাদ, ইতিহাস, লোকগাথা-নির্ভর কনটেন্টের চাহিদা তুঙ্গে। টালিগঞ্জের হাতে আছে চিত্তরঞ্জন, সূর্য সেন, প্রীতিলতা, নেতাজি, বাঘাযতীন। কেন্দ্রের সমর্থন পেলে এই গল্পগুলো বড় ক্যানভাসে প্যান-ইন্ডিয়া মুক্তি পেতে পারে। কিন্তু ঝুঁকিও আছে। যদি অনুদান, হল, অ্যাওয়ার্ডের রং শুধু সবুজ থেকে গেরুয়া হয়, কিন্তু স্বজনপোষণ থেকেই যায়, তবে কনটেন্টের বাজার বাড়বে না। সুদীপ্তা চক্রবর্তীর কথায়, “নিরপেক্ষতার বদলে পদ্মফুলকে আঁকড়ে ধরলে পরিস্থিতি বিশেষ বদলাবে না”। দর্শক এখন রাজনীতি নয়, গল্প চায়। ‘বল্লভপুরের রূপকথা’, ‘অপরাজিত’র মতো ছবি কোনও রাজনৈতিক ছাতা ছাড়াই জাতীয় পুরস্কার এনেছে। তাই ইন্ডাস্ট্রি যদি দলীয় অফিসের এক্সটেনশন কাউন্টার হয়ে যায়, প্যান-ইন্ডিয়া দূরের কথা, লোকাল বাজারও হারাতে হবে। টালিগঞ্জের সামনে এখন দুটো রাস্তা। এক, ক্ষমতার রং দেখে ক্যাম্প বদলে সরকারি সুবিধা নেওয়া। দুই, ক্ষমতাকে ব্যবহার করে বাংলা গল্পকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যাওয়া। প্রথমটা সাময়িক স্বস্তি দেবে, দ্বিতীয়টা ইন্ডাস্ট্রিকে ১০০ বছরের সেরা ব্যবসা দিতে পারে। জিৎ-অঙ্কুশ-যশের পোস্ট দেখে মনে হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রি দ্বিতীয় রাস্তাটাই মাপছে। কারণ প্যান-ইন্ডিয়া মানে শুধু হিন্দি ডাবিং নয়, ‘RRR’-এর মতো গ্লোবাল আইডেন্টিটি। টালিগঞ্জের হাতে রসদ আছে— সত্যজিৎ-ঋত্বিকের উত্তরাধিকার, নতুন OTT-জেনারেশনের টেকনিশিয়ান, আর এবার কেন্দ্রের পলিটিক্যাল উইল। পালাবদলের পর টলিউড যদি গল্পের উপর বাজি ধরে, তবে ‘বাংলা কনটেন্ট’ই হবে পরের ‘বাহুবলী’। আর যদি শুধু রং বদলায়, তবে পর্দা নামবে সেই পুরনো স্ক্রিপ্টেই— ক্ষমতার ছাতা, আর ছাতার তলায় ভিড়। আপাতত স্টুডিওপাড়া আশায় বুক বাঁধছে। কারণ দর্শক ভোট দেয় টিকিট কেটে, ব্যালটে নয়।