ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর হামলা: জাদুকাটায় কারা এত শক্তিশালী?
অমিত তালুকদার, সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জের আলোচিত-সমালোচিত নদী জাদুকাটা আবারও আলোচনায়। ‘রূপের রাণী’খ্যাত এই নদী বহুদিন ধরেই অবৈধ বালু উত্তোলন, ড্রেজার তাণ্ডব এবং পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে খবরের শিরোনাম হচ্ছে। কিন্তু এবার ঘটনা আরও উদ্বেগজনক অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নেতৃত্বদানকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের ওপরই হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, জাদুকাটায় কারা এত প্রভাবশালী যে তারা প্রশাসনের উপস্থিতিকেও তোয়াক্কা করছে না?
নদীর পার কেটে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ এবং অসংখ্য মানুষের বসতবাড়ি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও রাতের আঁধারে প্রভাবশালী চক্র ড্রেজার চালিয়ে বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে। এতে নদীভাঙন বাড়ছে, বিলীন হচ্ছে বসতি, আর জনজীবন হয়ে উঠছে বিপর্যস্ত।
শুধু অবৈধ বালু উত্তোলনেই সীমাবদ্ধ নয় অভিযোগ। নদীপথে বিআইডব্লিউটিএ, খাস কালেকশন ও টুল ট্যাক্সের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, শ্রমিক হয়রানি এবং ইজারাদারদের দৌরাত্ম্য নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ রয়েছে। এসব অনিয়ম নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে এবং গত ২৬ এপ্রিল অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষরে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।
এরই অংশ হিসেবে শনিবার দিবাগত রাতে সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রবিউর রায়হান-এর নেতৃত্বে জাদুকাটা নদীতে অভিযান চালানো হয়। রাত আনুমানিক ১টা ২০ মিনিটে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সত্রিশ গ্রাম এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সময় ২টি স্টিলবডি নৌকা ও ৩টি ড্রেজারবাহী কাঠের নৌকা শনাক্ত করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে বালু উত্তোলনকারীরা পালিয়ে যায়।
কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ মোড় নেয়। অভিযোগ রয়েছে, সত্রিশ গ্রামের কয়েকশ মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে নদীর পাড়ে জড়ো হয়ে মোবাইল কোর্ট টিমকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করে এবং হামলা চালায়। এতে স্পিডবোট চালকসহ দুজন আহত হন। ম্যাজিস্ট্রেটও হামলার শিকার হন বলে জানা গেছে। পরে নৌ-পুলিশ ও বাদাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির সহযোগিতায় পুনরায় অভিযান চালিয়ে ২টি বাল্কহেড ও ১টি ড্রেজারবাহী নৌকা জব্দ করা হয়।
ঘটনাস্থল থেকে মিলন মিয়া নামের এক বাল্কহেড মালিককে আটক করে ৯০ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পাশাপাশি হামলার ঘটনায় নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রবিউর রায়হান বলেন, “খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া যায়। নৌযান জব্দ করার সময় শতাধিক লোক হামলা চালায়। আমি নিজেও হামলার শিকার হয়েছি। জনস্বার্থে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনের ওপর সরাসরি হামলার সাহস এই চক্র কোথা থেকে পাচ্ছে? স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে। ফলে অভিযান হলেও তা টেকসই হচ্ছে না।
জাদুকাটাকে ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন একটাই শুধু অভিযানে নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের নেপথ্যের মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে কি না। কারণ প্রশাসনের ওপর হামলার এই ঘটনা কেবল আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতিও সরাসরি চ্যালেঞ্জ।