দুই মাসে অস্ত্র-মাদক উদ্ধার, ওয়ারেন্ট নিষ্পত্তি ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় মাগুরা জেলা পুলিশের উল্লেখযোগ্য সাফল্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
মাগুরা জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ দমন এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদারে গত দুই মাসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে জেলা পুলিশ। জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিশেষ অভিযান, বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ মার্চ থেকে ২৯ মে ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার, ওয়ারেন্ট নিষ্পত্তি, চুরি ও হত্যাকাণ্ডের মামলা উদ্ঘাটন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার-
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও দাঙ্গা প্রতিরোধে পরিচালিত অভিযানে জেলা পুলিশ ৪টি ওয়ান শুটার গান, ২টি শর্টগানের কার্তুজ, ২টি চায়নিজ কুড়াল, ২টি চাপাতি, ৫টি হাসুয়া, ৩৮টি রামদা, ২টি ছোরা, ১টি ছেন্দা, ৬টি দা, ১৭৬টি সড়কি, ১০টি কাঁচি, ৩টি ফুলকোচ, ৪টি বল্লম, ১টি লোহার কোচ, ১টি লোহার রড, ৩টি বাঁশের লাঠি, ৪৯টি বেতের ঢাল এবং ৪টি ফলা উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় ২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, ২০২৫ সালের একই সময়ে যেখানে মোট ৫৯টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল, সেখানে চলতি বছরে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযানে দ্বিগুণ সাফল্য-
মাদকবিরোধী অভিযানে গত দুই মাসে জেলার বিভিন্ন থানায় মোট ৮৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ১০৬ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে মামলা হয়েছিল ৪২টি এবং গ্রেপ্তার হয়েছিল ৬০ জন।
অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ৩ গ্রাম হেরোইন, ৪৫ বোতল ফেনসিডিল, ৪ কেজি ৭৮৫ গ্রাম গাঁজা এবং ১ হাজার ৭২৩ পিস ইয়াবা।
উদ্ধার হয়েছে ৮৯টি মোবাইল ও ৭টি মোটরসাইকেল
হারানো ও চুরি যাওয়া সম্পদ উদ্ধারে পরিচালিত অভিযানে জেলা পুলিশ ৮৯টি মোবাইল ফোন এবং ৭টি চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে। এ সময় চোরচক্রের দুই সক্রিয় সদস্যকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ওয়ারেন্ট নিষ্পত্তিতে অগ্রগতি-
পুলিশ জানায়, চলতি বছরে ৭৮৯টি ওয়ারেন্ট প্রাপ্ত হলেও বিগত বছরের বকেয়াসহ মোট ৭৯৮টি ওয়ারেন্ট নিষ্পত্তি করা হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৭১ জনের বিরুদ্ধে নন-এফআইআর প্রসিকিউশন দাখিল করা হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৫৫ জন।
চুরি ও হত্যা মামলার দ্রুত তদন্ত-
গত দুই মাসে জেলার ৮টি চুরি মামলায় ৯ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং চুরি যাওয়া গরু ও নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ছাড়া এ সময়ে সংঘটিত ৬টি হত্যা মামলার মধ্যে ৩টির আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঝিনাইদহে তেলবাহী ট্রাকে সংঘটিত এক ব্যবসায়ী হত্যার ঘটনায়ও মাগুরা জেলা পুলিশ মামলা গ্রহণ করে আসামি গ্রেপ্তার ও মালামাল উদ্ধারে ভূমিকা রাখে।
গণধর্ষণ মামলায় দ্রুত পদক্ষেপ-
শ্রীপুরে সংঘটিত আলোচিত একটি গণধর্ষণ মামলায় জেলা পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে ৪ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা আদালতে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জবানবন্দি দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীকেও উদ্ধার করা হয়েছে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড-
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মহাসড়ক ও সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ট্রাফিক বিভাগ ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ সময়ে ৪২৪টি প্রসিকিউশন দাখিল করা হয় এবং ১৫২টি যানবাহনকে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা হয়।
এর ফলে সরকারি কোষাগারে ১৬ লাখ ৬৮ হাজার ৪০০ টাকা জরিমানা জমা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কমিউনিটি পুলিশিংয়ে গুরুত্ব, দাঙ্গামুক্ত রাখার উদ্যোগ
জেলায় দাঙ্গা প্রতিরোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে পুলিশ সুপার নিজে বিভিন্ন দাঙ্গাপ্রবণ এলাকায় গিয়ে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ সংক্রান্ত ১৩টি মামলায় ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে দাঙ্গাজনিত কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি।
মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন বলেন, জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে নিয়মিত পুলিশি কার্যক্রমের পাশাপাশি বিট ও কমিউনিটি পুলিশিং আরও জোরদার করা হবে। তিনি বলেন, মাগুরাকে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও অপরাধমুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।