1. shahinsalman99@gmail.com : Dhakar somoy : Dhakar somoy
  2. bditwork247@gmail.com : admin : Badhon Sarkar
  3. thedhakarsomoy@gmail.com : thedhakarsomoy :
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ০৪:২৭ অপরাহ্ন

জাদুকাটার আর্তনাদ: লুটের রাত, নীরবতার দায়।

অমিত তালুকদার, সুনামগঞ্জ।
  • আপডেটের সময় : মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬
  • ৩৫ সময়

জাদুকাটার আর্তনাদ: লুটের রাত, নীরবতার দায়।

অমিত তালুকদার, সুনামগঞ্জ।
রাত নামলেই যেন বদলে যায় জাদুকাটার চেহারা। দিনের আলোয় যে নদী পর্যটকের চোখে রূপের বিস্ময় হয়ে ধরা দেয়, গভীর রাতে সেই নদীর বুকজুড়ে ভেসে ওঠে আতঙ্ক, অভিযোগ আর অসহায়তার দীর্ঘশ্বাস। নদীর দুই পাড়ের মানুষের ভাষায় জাদুকাটা যেন এখন “লুটেপুটে দে মা, চেটেপুটে খাই” বাস্তবতার এক নির্মম উপাখ্যান।

মঙ্গলবার দিবাগত রাতের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয় সাংবাদিক সাজ্জাদ হোসেনের একাধিক পোস্টকে ঘিরে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। তিনি দাবি করেন, তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পরিবেশ বিধ্বংসী ড্রেজার বা বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের প্রস্তুতি চলছে। তাঁর আহ্বান ছিল, স্থানীয় জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলে এসব কর্মকাণ্ড প্রতিহত করা সম্ভব।
পোস্টের মন্তব্যঘরেও উঠে আসে উদ্বেগের বহুমাত্রিক প্রতিধ্বনি। কেউ জানান, লাউড়েরগড় পর্যন্ত পাড় কাটা পৌঁছে গেছে। কেউ অভিযোগ করেন, ঘাগটিয়াতেও শুরু হয়েছে একই তৎপরতা। আবার অনেকে প্রকাশ করেন ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা।

এর আগে সাজ্জাদ হোসেন আরেক পোস্টে লিখেছিলেন, জাদুকাটার বুকে চলছে বালু লুটের প্রস্তুতি এবং তিনি প্রয়োজনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের নাম প্রকাশ করবেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ মন্তব্য করেন, নদী ও হাওরঘেরা জনপদের সম্পদ যেন একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কবলে বন্দি হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোবারক হোসেন অভিযোগ করেন, বিজিবি ক্যাম্পের নিকটবর্তী ইজারামুক্ত এলাকা থেকেও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। তাঁর প্রশ্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেও যদি এসব কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকে, তবে সাধারণ মানুষ আশ্রয় খুঁজবে কোথায়?

এলাকাবাসীর দাবি, তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের পাটানপাড়া বাজারসংলগ্ন এলাকা এবং বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের মিয়ারচর গ্রামের সামনে প্রতিরাতে অসংখ্য ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্যমতে, রাত গভীর হলে নদীর বুকে শুরু হয় এক নীরব উৎসব যার মূল্য পরিশোধ করছে প্রকৃতি, কৃষিজমি ও নদীপারের মানুষ।
অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও অনেক সময় তাৎক্ষণিক প্রতিকার মিলছে না। তবে গভীর রাতে ফোন পেয়ে সাড়া দেন জেলা পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন পিপিএম।

তিনি বলেন, ইজারাদাররা আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে বালু উত্তোলনের অনুমতি পেয়েছেন এমন তথ্য তিনি শুনেছেন। ইজারা প্রদান করেছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। সে ক্ষেত্রে বৈধ অনুমোদনের আওতায় পরিচালিত কার্যক্রমে পুলিশের হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত।
তবে নদীর তীর কাটার বিষয়ে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও কঠোর।
পুলিশ সুপার বলেন,

“নদীর পাড় কাটাতো দূরের কথা, নদীর পাড়ে একটি পিঁপড়াও নামতে পারবে না।”

তিনি আরও জানান, নদী রক্ষায় পুলিশ ইতোমধ্যে ৫১টি মামলায় ২৯৯ জনকে আসামি করেছে। কিন্তু আইনি জটিলতায় কাউকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি বলে তাঁর দাবি।

পুলিশ সুপারের মতে, শুধু পুলিশি উদ্যোগে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, বিজিবি, র‌্যাব এবং পুলিশকে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। বিদ্যমান বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জাদুকাটা শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি ভাটির মানুষের স্মৃতি, জীবিকা, পর্যটনের সম্ভাবনা এবং প্রকৃতির এক অনন্য ঐশ্বর্য। সেই নদীর তীর যদি রাতের অন্ধকারে ক্ষতবিক্ষত হয়, তবে ক্ষয় হয় শুধু মাটির নয় ক্ষয় হয় মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা, আইনের প্রতি বিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রাকৃতিক অধিকার।

প্রশ্ন উঠছে, অভিযোগগুলো কি শুধুই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষোভ, নাকি বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি? যদি অভিযোগ সত্য হয়, তবে কারা জবাবদিহির মুখোমুখি হবে? আর যদি তা অতিরঞ্জিত হয়, তবে বিভ্রান্তি দূর করতে প্রকাশ্য তদন্ত ও স্বচ্ছ তথ্য উপস্থাপনের উদ্যোগ কোথায়?

জাদুকাটা আজ উত্তর খুঁজছে। নদীর জল এখনো বয়ে যায় পাহাড় থেকে সমতলে। কিন্তু সেই জলের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে কি আমাদের দায়িত্ববোধও? জাদুকাটার পাড়ের মানুষ এখন আর শুধু অভিযান চায় না; তারা চায় দৃশ্যমান জবাবদিহি। তারা চায় এমন এক প্রশাসনিক সমন্বয়, যেখানে রাতের অন্ধকার নয়, আইনের আলো শেষ কথা বলবে।
কারণ একটি নদী বাঁচানো মানে শুধু বালু রক্ষা নয় একটি জনপদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2019 TV Site
Design By BDit.com.bd