
করিমগঞ্জে মোবাইল চুরির অভিযোগ ঘিরে সংঘর্ষ: বন্ধুর ছুরিকাঘাতে কিশোর নিহত, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার
মোঃজোনায়েদ হোসেন জুয়েল
স্টাফ রিপোর্টার
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলায় মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বিরোধ শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী ঘটনায় রূপ নিয়েছে। তুচ্ছ একটি অভিযোগের জেরে সংঘটিত ছুরিকাঘাতে অপু (১৪) নামে এক কিশোর নিহত হয়েছে। নিহত ও অভিযুক্ত সম্পর্কে খালাতো ভাই হওয়ার পাশাপাশি তারা দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। এ মর্মান্তিক ঘটনায় এলাকাজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার কাদিরজঙ্গল ইউনিয়নের সাতারপুর গ্রামের বাসিন্দা মাহাবুব আলমের ছেলে সীমান্ত (১৫) কয়েকদিন আগে অভিযোগ করেন যে, তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি একই গ্রামের বাবুল মিয়ার ছেলে অপু চুরি করেছে। অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে গ্রাম্যভাবে একাধিকবার সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ বা সাক্ষ্য না পাওয়ায় সালিশকারীরা অপুকে নির্দোষ ঘোষণা করেন।
সালিশে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত না হলেও দুই কিশোরের মধ্যে বিরোধের অবসান হয়নি। বরং মোবাইল ফোনের বিষয়টি নিয়ে উভয়ের মধ্যে কয়েকদিন ধরে উত্তেজনা, বাকবিতণ্ডা ও মনোমালিন্য চলতে থাকে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে মীমাংসা হলেও উভয়ের মধ্যে ক্ষোভ থেকেই যায়।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) দুপুর আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটে সাতারপুর বাজারের ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় সীমান্ত অপুকে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে আবারও মোবাইল ফোনের অভিযোগ নিয়ে তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সীমান্ত একটি ধারালো ছুরি দিয়ে অপুর বুকে আঘাত করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা দ্রুত অপুকে উদ্ধার করে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্বজনদের আহাজারিতে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পরপরই করিমগঞ্জ থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে অভিযুক্ত সীমান্তকে গ্রেপ্তার করে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারেরও চেষ্টা চলছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
নিহতের মামা সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, “আমার ভাগিনা অত্যন্ত ভদ্র, শান্ত ও মেধাবী ছেলে ছিল। একটি ভিত্তিহীন অভিযোগের জেরে তাকে এভাবে প্রাণ দিতে হবে, তা আমরা কখনো কল্পনাও করিনি। আমরা এই হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিহত ও অভিযুক্ত একই পরিবারের আত্মীয় এবং দীর্ঘদিনের বন্ধু হওয়ায় এ ঘটনা সবাইকে স্তম্ভিত করেছে। সামান্য একটি অভিযোগ থেকে এমন মর্মান্তিক পরিণতি হতে পারে, তা কেউ ভাবতে পারেননি।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে ঘটনার পর সাতারপুর গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে কিশোরদের মধ্যে সামান্য বিরোধ কীভাবে ভয়াবহ অপরাধে রূপ নিতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তারা পারিবারিক নজরদারি, সামাজিক সচেতনতা এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।