1. shahinsalman99@gmail.com : Dhakar somoy : Dhakar somoy
  2. bditwork247@gmail.com : admin : Badhon Sarkar
  3. thedhakarsomoy@gmail.com : thedhakarsomoy :
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১২:১৫ পূর্বাহ্ন

আইডিআরএ’র নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে শুভেচ্ছা, নীরবতা ও প্রত্যাশা: বীমা খাত কি নতুন পথের সন্ধানে?

এম হোসাইন আহমদ 
  • আপডেটের সময় : মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
  • ২০ সময়

আইডিআরএ’র নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে শুভেচ্ছা, নীরবতা ও প্রত্যাশা: বীমা খাত কি নতুন পথের সন্ধানে?

 

এম হোসাইন আহমদ

 

বাংলাদেশের বীমা খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকট, অনিয়ম, আস্থাহীনতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। এই বাস্তবতায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মীর নাদিয়া নিভিন- এর দায়িত্ব গ্রহণ নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। দেশের বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো একজন নারী চেয়ারম্যানের আগমন শুধু প্রতীকী অর্জন নয়, এটি একটি সম্ভাবনার দরজাও খুলে দিয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দেশের কয়েকটি জীবন ও সাধারণ বীমা কোম্পানি ফুলেল শুভেচ্ছা, সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং অভিনন্দন বার্তার মাধ্যমে নতুন চেয়ারম্যানকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সামনে এসেছে আরেকটি প্রশ্ন – সবাই কি একইভাবে এগিয়ে এসেছে? যারা এখনো শুভেচ্ছা জানায়নি, তাদের নীরবতার ব্যাখ্যা কী?

বিষয়টি নিছক ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কারণ, কোনো গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নতুন নেতৃত্ব এলে সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে সৌজন্য শুভেচ্ছা জানানো শুধু প্রথা নয়, এটি পারস্পরিক সম্মান, পেশাগত সৌজন্য এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন বীমা খাত নানা প্রশ্নের মুখে – দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, আর্থিক দুর্বলতা, গ্রাহকসেবায় ঘাটতি, বাজার শৃঙ্খলার অভাব, স্বচ্ছতার সংকট এবং সুশাসনের দুর্বলতা – তখন নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে পুরো খাতের সম্মিলিত ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার সুযোগ ছিল।

বাস্তবতা হলো, কিছু কোম্পানি দ্রুত এগিয়ে এলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো দৃশ্যত নীরব। এই নীরবতাকে এক কথায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। কেউ বলতে পারেন, এটি কেবল আনুষ্ঠানিক বিলম্ব বা সময়ের অভাব। কিন্তু বীমা খাতের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা বিবেচনায় প্রশ্ন উঠতেই পারে – এ নীরবতা কি নিছক দেরি, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো মনস্তত্ত্ব? বীমা খাতে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন গ্রুপিং, লবিং, ব্যক্তিকেন্দ্রিক অবস্থান, ক্ষমতার অদৃশ্য বলয় এবং প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ফলে অনেকেই ভাবছেন, কিছু প্রতিষ্ঠান কি এখনো নতুন নেতৃত্বের অবস্থান বুঝে নিতে চাইছে? কেউ কি অপেক্ষা করছে, বাতাস কোনদিকে যায় তা দেখার জন্য? নাকি নতুন চেয়ারম্যানের সম্ভাব্য সংস্কারমুখী অবস্থান, জবাবদিহি নিশ্চিতের উদ্যোগ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান – কিছু মহলে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে বলেই এই দূরত্ব?

তবে এটিও সত্য, কে ফুল দিল আর কে দিল না – এই প্রশ্নে পুরো বিষয়টির মূল্যায়ন শেষ হয়ে যায় না। শুভেচ্ছা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নতুন নেতৃত্বের প্রতি সংশ্লিষ্টদের বাস্তব সমর্থন। বীমা খাতকে সুস্থ ও টেকসই পথে ফেরাতে কেবল আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নীতিগত সহযোগিতা, নিয়ম মানার সংস্কৃতি, গ্রাহকবান্ধব আচরণ এবং বাজার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক অঙ্গীকার।

বর্তমান চেয়ারম্যানের কাছে প্রত্যাশা

আইডিআরএ’র নতুন চেয়ারম্যানের কাছে বীমা খাতের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো – এই শিল্পকে নতুন আস্থা, নতুন শৃঙ্খলা এবং নতুন গতির পথে এগিয়ে নেওয়া। দীর্ঘদিন ধরে বীমা খাতের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো দাবি পরিশোধে জটিলতা ও বিলম্ব। অনেকে প্রিমিয়াম দেন নিয়মিত, কিন্তু ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সময় পড়তে হয় নানা ভোগান্তিতে। এর ফলে বীমার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এই আস্থাহীনতার দেয়াল ভাঙতে হলে প্রথমেই দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়াকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।

একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, সলভেন্সি, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং পরিচালনা কাঠামোর ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অনেক কোম্পানির বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দায়বদ্ধতার ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আইডিআরএকে শুধু নিয়ম জারি করলেই হবে না, সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শাস্তি ও প্রণোদনা – দুই ব্যবস্থাই কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। যারা নিয়ম মানবে, গ্রাহকসেবা উন্নত করবে এবং বাজারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, তাদের উৎসাহিত করতে হবে; আর যারা অনিয়মে জড়াবে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।

ডিজিটাল তদারকি ব্যবস্থাও এখন সময়ের দাবি। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং, অনলাইন রিপোর্টিং, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং কোম্পানির আর্থিক অবস্থার রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ছাড়া বীমা খাতকে আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় আনা কঠিন। নতুন চেয়ারম্যান চাইলে এই জায়গায় একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেন। একই সঙ্গে বীমা খাতে জনসচেতনতা বাড়ানো, নতুন পণ্য উদ্ভাবন, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বীমা সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং ইসলামী বীমা বা মাইক্রোইন্স্যুরেন্সের মতো সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোতেও কার্যকর নীতি সহায়তা দিতে হবে।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের কাছে প্রত্যাশা

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম বীমা খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার প্ল্যাটফর্ম। এই ফোরামের কাছে প্রত্যাশা—তারা যেন কেবল আনুষ্ঠানিক সভা- সেমিনারে সীমাবদ্ধ না থেকে বীমা খাতের বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সামনে গঠনমূলক প্রস্তাব তুলে ধরে। বীমা শিল্পে আস্থা ফিরিয়ে আনতে, গ্রাহকসেবার মান উন্নত করতে, কোম্পানিগুলোর মধ্যে নৈতিক ব্যবসাচর্চা জোরদার করতে এবং পেশাদার নেতৃত্ব গড়ে তুলতে ফোরামকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

ফোরাম চাইলে কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে – কে বেশি গ্রাহকবান্ধব, কে দ্রুত দাবি পরিশোধ করে, কে স্বচ্ছতা বজায় রাখে, কে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দিচ্ছে। একই সঙ্গে গবেষণা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে বীমা খাতের জন্য একটি আধুনিক রূপরেখা তৈরিতেও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম বড় ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন চেয়ারম্যানের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ, সমস্যার তালিকা, সম্ভাবনার খসড়া এবং বাস্তবসম্মত সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তাদের দায়িত্ব কম নয়।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের কাছে প্রত্যাশা

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন সরাসরি কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। তাই এই সংগঠনের ভূমিকা আরও বেশি বাস্তব ও ফলপ্রসূ হওয়া প্রয়োজন। অ্যাসোসিয়েশনের কাছে প্রত্যাশা -তারা সদস্য কোম্পানিগুলোকে শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থে একত্র করবে না; বরং সুশাসন, জবাবদিহি, গ্রাহকের অধিকার, নৈতিক বিপণন এবং আইন মেনে পরিচালনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দেবে।

অ্যাসোসিয়েশন চাইলে একটি স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রিত আচরণবিধি চালু করতে পারে, যেখানে দাবি নিষ্পত্তির সময়সীমা, গ্রাহক অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা বন্ধ, এজেন্টদের প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক প্রতিবেদনের মানোন্নয়ন – এসব বিষয়ে সদস্য কোম্পানির জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে। একই সঙ্গে যেসব কোম্পানি বারবার অভিযোগের জন্ম দিচ্ছে বা খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে, তাদের বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশনকে নির্লিপ্ত না থেকে নৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। নতুন চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিরোধ নয়, বরং সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলে খাতের সামগ্রিক উন্নয়নে অ্যাসোসিয়েশনকে এগিয়ে আসতে হবে।

সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে

বাংলাদেশের বীমা শিল্পের সংকট এতটাই গভীর যে একক কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা একা এর সমাধান করতে পারবে না। আইডিআরএ, বীমা কোম্পানিগুলো, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন, পেশাজীবী সংগঠন, উদ্যোক্তা এবং গ্রাহক – সব পক্ষকে একটি যৌথ লক্ষ্য সামনে রেখে এগোতে হবে। সেই লক্ষ্য হলো – বীমা শিল্পকে একটি আস্থাভিত্তিক, স্বচ্ছ, আধুনিক ও জনমুখী খাতে পরিণত করা।

ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো সহজ, কিন্তু প্রকৃত শুভেচ্ছা হবে নিয়ম মেনে চলা, গ্রাহকের দাবি দ্রুত পরিশোধ করা, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অনিয়ম থেকে সরে আসা এবং নতুন নেতৃত্বের সংস্কার উদ্যোগে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করা। নতুন চেয়ারম্যানের জন্য এটি যেমন একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি এটি বীমা কোম্পানিগুলোর জন্যও নিজেদের নতুন করে প্রমাণ করার সুযোগ।

আজ প্রশ্নটা শুধু এই নয় -কে ফুল দিল, আর কে দিল না। বড় প্রশ্ন হলো, বীমা খাতের এই নতুন অধ্যায়ে কে সত্যিকার অর্থে পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়াবে, আর কে পুরোনো অচল সংস্কৃতির আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখবে। নীরবতা হয়তো সাময়িক; কিন্তু সময়ই বলে দেবে, সেটি ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক বিলম্ব, নাকি পরিবর্তনের প্রতি অনীহা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বাংলাদেশের বীমা শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে আর আলাদা আলাদা বলয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ নেই। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতেই হবে। তবেই এই শিল্প ফিরে পাবে আস্থা, শক্তি ও সম্ভাবনার নতুন ঠিকানা।

 

লেখক পরিচিতিঃ

সাংবাদিক ও বীমা বিশ্লেষক

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2019 TV Site
Design By BDit.com.bd