1. shahinsalman99@gmail.com : Dhakar somoy : Dhakar somoy
  2. bditwork247@gmail.com : admin : Badhon Sarkar
  3. thedhakarsomoy@gmail.com : thedhakarsomoy :
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ন

খুলনা ওয়াসা : আওয়ামী লীগের অনিয়ম-দুর্নীতির পর, জামায়াতিদের কালো থাবা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেটের সময় : মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬
  • ২৮ সময়

খুলনা ওয়াসা : আওয়ামী লীগের অনিয়ম-দুর্নীতির পর, জামায়াতিদের কালো থাবা

নিজস্ব প্রতিবেদক:
খুলনাবাসীর সুপেয় পানির সংকট নিরসন ও লবণাক্ততা দূরীকরণের লক্ষ্যে ২০০৮ সালে গণআন্দোলনের মুখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘খুলনা ওয়াসা’। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জনগুরুত্বপূর্ণ এই সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানটি বারবার রাজনৈতিক ক্ষমতার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের একচ্ছত্র দাপট এবং অনিয়ম-দুর্নীতির পর, পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এবার প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে শুরু হয়েছে জামায়াতপন্থী একটি চক্রের নতুন চক্রান্ত। যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সরিয়ে পুনরায় ওয়াসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য চলছে চরম তদবির ও ষড়যন্ত্র। অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

স্বজনপ্রীতি ও অদক্ষতার মাশুল দিচ্ছে খুলনাবাসী:
মো: আব্দুল্লাহর মেয়াদে প্রথম দিকে কুয়েটের অধীনে একটি স্বচ্ছ নিয়োগ পরীক্ষা হলেও, ২০১৩ সাল থেকে শুরু হয় নগ্ন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের ডিও লেটার এবং শেখ হাসিনার ‘বিশেষ বিবেচনায়’ খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ-১)-এর পিএমইউ ইউনিটে ১০ জন প্রকৌশলীকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের একমাত্র যোগ্যতা ছিল তারা আওয়ামী পরিবারের সদস্য।

পানি সরবরাহ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ এই কর্মকর্তাদের তথা প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন ও আরমান সিদ্দিক প্রমুখ কে দিয়ে ‘ফেজ-১’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় আজ চরম মাশুল দিচ্ছে খুলনাবাসী। ওয়াসার নতুন সরবরাহ লাইনে যেখানে সিস্টেম লস ১০% থাকার কথা, সেখানে তা দাঁড়িয়েছে ২৫%-এ। ভুয়া পানির লাইন বসিয়ে ঠিকাদারদের কোটি কোটি টাকা বিল পাইয়ে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। ফলশ্রুতিতে, ২৮, ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডসহ নগরীর অধিকাংশ এলাকায় বছরের পুরোটা সময় পানির তীব্র সংকট লেগেই থাকে।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও যোগ্যদের বঞ্চনা
আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রকৌশলীদের অনৈতিক সুবিধা দিতে গিয়ে ওয়াসার সিনিয়র ও যোগ্য কর্মকর্তাদের বছরের পর বছর বঞ্চিত করা হয়েছে। ওয়াসার সিনিয়র নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মো: রেজাউল ইসলামকে শুধুমাত্র তার বাবার ‘বিএনপি ব্যাকগ্রাউন্ড’ থাকার কারণে দীর্ঘ ১৫ বছর পদোন্নতি দেওয়া হয়নি।

এমনকি ২০২৭ সালে সমাপ্তব্য ‘খুলনা স্যুয়ারেজ উন্নয়ন প্রকল্প’-এর পিডি ও নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়োগের ক্ষেত্রেও সিনিয়র প্রকৌশলী মো: রেজাউল ইসলামকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে ‘পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ-২)’-এর ফিজিবিলিটি স্টাডি ও ডিপিপি প্রণয়নের সময়ও তৎকালীন এমডি মো: আব্দুল্লাহ তার চাকুরির শেষ কর্মদিবসে স্যুয়ারেজ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী কামাল হোসেনকে (যিনি চলমান প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন) সরিয়ে এই নতুন প্রকল্পের ‘ফোকাল পারসন’ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে যান।

পটপরিবর্তন: এমডির ভোল বদল ও জামায়াতি ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতন ঘটলে সুচতুর সাবেক এমডি মো: আব্দুল্লাহ রাতারাতি তার রাজনৈতিক চরিত্র পরিবর্তন করেন। ওয়াসার জামায়াতপন্থী কর্মচারী মুকুলের মাধ্যমে তিনি জামায়াতের একাধিক অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে আসন গ্রহণ করা শুরু করেন। এমনকি জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের ডিও লেটার সংগ্রহ করে পুনরায় খুলনা ওয়াসার এমডি হওয়ার জন্য জোর তদবির চালান, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দৃঢ়তার কারণে ব্যর্থ হয়।

বউয়ের ‘জামায়াত রোকন’ পরিচয় খাটিয়ে কামালের জোর জবরদস্তি:
এই বঞ্চনার নেপথ্যে মূল খলনায়ক হিসেবে উঠে এসেছে নির্বাহী প্রকৌশলী কামাল হোসেনের নাম। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কামাল হোসেনের স্ত্রী জামায়াতের একজন সক্রিয় ‘রোকন’। আর এই পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ওয়াসায় নিজের একক সম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন কামাল। আওয়ামী লীগের শাসনামলের শেষ কর্মদিবসে তৎকালীন সুচতুর এমডি মো: আব্দুল্লাহকে চরম চাপ প্রয়োগ করে কামাল হোসেন চলমান প্রকল্পের দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও ‘পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ-২)’-এর ফোকাল পারসনের পদটি জোরপূর্বক বাগিয়ে নেন।

ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কামাল হোসেনের কাজে অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে সেই পদ থেকে অব্যাহতি দেয় এবং সিনিয়র নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মো: রেজাউল ইসলামকে নিয়োগ দিয়ে একটি সরকারি পত্র জারি করে। কিন্তু ক্ষমতার মোহে অন্ধ কামাল হোসেন তার স্ত্রীর জামায়াতি প্রভাব, স্থানীয় জামায়াত নেতা ও তাদের অনুসারী কতিপয় সাংবাদিকদের মোটা টাকার বিনিময়ে ব্যবহার করে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসাইস শওকতকে ঘেরাও ও চাপ সৃষ্টি করেন। ফলশ্রুতিতে, ভারপ্রাপ্ত এমডি মো: রেজাউল ইসলামের নামে জারি হওয়া বৈধ সরকারি পত্রটি বাতিল করতে বাধ্য হন।

‘বন্ধু মিডিয়া’ দিয়ে চরিত্রহনন ও রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস:
প্রকৌশলী কামাল হোসেনের অপকর্মের এখানেই শেষ নয়। মো: রেজাউল ইসলামের নামে একের পর এক বানোয়াট, কাল্পনিক ও মিথ্যা তথ্যকে সত্য রূপ দেওয়ার জন্য তিনি জামায়াত সমর্থিত কিছু ‘বন্ধু মিডিয়া’ ও সাংবাদিকদের মোটা টাকার বিনিময়ে ব্যবহার করছেন। কামালের সরবরাহ করা ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওইসব মিডিয়ায় নিয়মিত মো: রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিউজ পরিবেশন করা হচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, নিজের স্বার্থসিদ্ধি এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে প্রকৌশলী কামাল হোসেন প্রকল্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রাষ্ট্রীয় গোপনীয় তথ্য সাংবাদিকদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন করে এভাবে তথ্য ফাঁস করার ঘটনা ওয়াসার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছেন এই সুচতুর প্রকৌশলী কামাল হোসেন।

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সেলিম খানের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্রের জাল:
বর্তমানে সরকার খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ-২)-এর জন্য একজন পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যেখানে যোগ্য প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। ওয়াসার সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তারা যাতে এই পদে আসতে না পারেন, সেজন্য কামাল হোসেন ও তার সংঘবদ্ধ চক্রটি উঠেপড়ে লেগেছে। অভিজ্ঞ ও সিনিয়র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সেলিম খান যেন কোনোভাবেই প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হতে না পারেন, সেজন্য তার বিরুদ্ধেও নানামুখী কুৎসা রটনা ও গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছেন কামাল। একই সাথে দীর্ঘ ১৫ বছর বঞ্চিত প্রকৌশলী মো: রেজাউল ইসলামের পথ রুদ্ধ করতেও এই চক্রটি সমানে টাকার খেলায় মেতেছেন।

ওয়াসার সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মতে, কামালের এই নগ্ন তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য হলো জামায়াতের নাম ভাঙ্গিয়ে প্রকৃতপক্ষে ওয়াসাতে পুনরায় বিতাড়িত ও গুপ্ত আওয়ামী লীগের রাজত্ব কায়েম রাখা। খুলনাবাসী ও ওয়াসার সচেতন মহল আশা করে, সরকারের এই তথ্য ফাঁসকারী ও তদবিরবাজ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে এবং কোনো ব্ল্যাকমেইলের শিকার না হয়ে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে যোগ্যদের ওয়াসার নেতৃত্বে আনবে।

সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী মো: রেজাউল ইসলামকে ৪ মাসের জন্য ‘ফেজ-২’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সরকার এই পদে একজন পূর্ণকালীন পিডি নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে, যার জন্য ওয়াসার যোগ্য ৪ জন প্রকৌশলীর সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত, সিনিয়র ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলী মো: রেজাউল ইসলাম যেন কোনোভাবেই পিডি হতে না পারেন এবং পদোন্নতি পেতে না পারেন, সেজন্য জামায়াতের একটি সংঘবদ্ধ চক্র মাঠে নেমেছে। এই চক্রটিকে প্রত্যক্ষভাবে অর্থায়ন করছে ওয়াসার ভেতরে থাকা একটি গোপন জামায়াতপন্থী গ্রুপ। সেখানে নেপথ্যে সহযোগীতা করছে ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক এম.ডি ও অন্যান্যরা। ওয়াসার সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আশঙ্কা, এই চক্রটির মূল উদ্দেশ্য হলো জামায়াতের নাম ব্যবহার করে প্রকৃতপক্ষে ওয়াসাতে পুনরায় সেই বিতাড়িত ও ছদ্মবেশী আওয়ামী সিন্ডিকেটের রাজত্ব কায়েম করা।

খুলনা ওয়াসার নবনিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ ফিরোজ শাহ্ বলেন, আমি মাত্র কয়েক দিন হল খুলনা ওয়াসাতে যোগদান করেছি। বিগত দিনের সমস্যা সমাধান করে যাতে নগরবাসীর কাছে সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারি এ নিয়ে আগামীতে কাজ করব। সকল প্রকার অনিয়মের ঊর্ধ্বে থেকে খুলনা ওয়াসাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব ইনশাল্লাহ।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান বলেন, ওয়াসার ২য় ফেজের কাজে যে পিডি নিয়োগ হবে এ জায়গায় দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া উচিত। বিগত দিনে খুলনা ওয়াসা নগরবাসীর কাঙ্খিত সেবা দিতে পারেনি ফলে মানুষের চাহিদা পূরণে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। যত্রতত্র গভীর নলকূপ স্থাপনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে এতে করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খুলনা শহরে ভূমিকম্প বা বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ের প্রতিও খুলনা ওয়াসাকে দৃষ্টি রাখতে হবে।

পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের সভাপতি এড. কুদরত-ই-খুদা বলেন, খুলনা ওয়াসা নিয়ে নগরবাসীর অসন্তোষের শেষ নাই। ওয়াসার মূল লক্ষ্য ছিল খুলনার মানুষের সূপেয় পানি সরবরাহ করা, সেটি তারা করতে পারেনি। যে পানিটা মধুমতি থেকে এনে দিচ্ছে ডমেস্টিক ইউজ ছাড়া কিছু হয় না। নাগরিক হিসেবে আমাদের চিন্তা এবং প্রস্তাবনা হচ্ছে সমস্ত রাজনৈতিক ঊর্ধ্বে থেকে যোগ্য ও কর্মক্ষম ব্যক্তি যিনি এই প্রজেক্ট এর জন্য উপযুক্ত হবেন তাকেই পিডি হিসেবে মনোনয়ন দেয়া উচিত।

ওয়াসার ফেজ-২ প্রকল্প খুলনাবাসীর জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খুলনাবাসী আশা করে, সরকার সম্পূর্ণ যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে এই প্রকল্পের পিডি নিয়োগ হবে। এতেকরে, নগরবাসী খুলনা ওয়াসার কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2019 TV Site
Design By BDit.com.bd