1. shahinsalman99@gmail.com : Dhakar somoy : Dhakar somoy
  2. bditwork247@gmail.com : admin : Badhon Sarkar
  3. thedhakarsomoy@gmail.com : thedhakarsomoy :
সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ০৯:২১ অপরাহ্ন

পরকীয়ার পেছনে কার দায়- ব্যক্তির, নাকি ভেঙে পড়া সম্পর্কের?

এম হোসাইন আহমদ
  • আপডেটের সময় : সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬
  • ৩১ সময়

পরকীয়ার পেছনে কার দায়- ব্যক্তির, নাকি ভেঙে পড়া সম্পর্কের?

 

এম হোসাইন আহমদ

 

পরকীয়া—শব্দটি আমাদের সমাজে এমন এক নেতিবাচক অভিঘাত বহন করে, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঘৃণা, ক্ষোভ, নিন্দা এবং একপাক্ষিক দোষারোপের দীর্ঘ সংস্কৃতি। কোনো সংসারে পরকীয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে এলে আমরা খুব দ্রুত একজন নারীকে “অবিশ্বস্ত” বা একজন পুরুষকে “চরিত্রহীন” আখ্যা দিয়ে ফেলি। যেন এই ঘটনার পেছনে আর কোনো ব্যাখ্যা নেই, নেই কোনো মনস্তাত্ত্বিক সংকট, নেই সম্পর্কের দীর্ঘদিনের ক্ষয়, নেই অবহেলা, নেই একাকীত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পরকীয়া কখনোই একদিনে জন্ম নেয় না; এটি ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া এক গভীর সম্পর্ক-সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

মানুষ কেন পরকীয়ায় জড়ায়—এই প্রশ্নের উত্তর কেবল “শরীরের চাহিদা” বা “লোভ” দিয়ে শেষ করা যায় না। সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের বিশ্লেষণ বলছে, পরকীয়ার পেছনে প্রায়ই কাজ করে আবেগীয় শূন্যতা, না-পাওয়ার বেদনা, দীর্ঘদিনের একাকীত্ব, অবহেলা, যোগাযোগহীনতা এবং সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা নীরব ক্ষোভ। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে যখন বোঝাপড়ার জায়গা সংকুচিত হয়, ভালোবাসার প্রকাশ হারিয়ে যায়, সহানুভূতি ও সহমর্মিতা কমে আসে, একে অপরকে মেনে নেওয়া ও মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে—তখনই সংসারের ভিতরে অদৃশ্য ফাটল তৈরি হতে থাকে। সেই ফাটল একসময় এতটাই বড় হয়ে ওঠে যে, বাইরের কেউ এসে সেখানে সহজেই প্রবেশ করতে পারে।

অনেক সময় দেখা যায়, একজন মানুষ তার নিজের ঘরেই ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে পড়েন। তার কথা শোনার কেউ নেই, কষ্ট বোঝার কেউ নেই, অভিমান রাখার জায়গা নেই, ভালোবাসা চাওয়ার ভাষাও যেন হারিয়ে যায়। সংসার তখন কেবল দায়িত্বের খাতা হয়ে দাঁড়ায়; থাকে হিসাব, থাকে প্রয়োজন, থাকে সামাজিক অবস্থান—কিন্তু থাকে না হৃদয়ের স্পর্শ। স্বামী বা স্ত্রী যখন দিনের পর দিন অবহেলা, উদাসীনতা, অবমূল্যায়ন কিংবা মানসিক দূরত্বের শিকার হন, তখন তাদের ভেতরে এক ধরনের নীরব শূন্যতা জন্ম নেয়। আর সেই শূন্যতার সুযোগ নেয় কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ। কেউ মিথ্যা প্রশংসা দিয়ে, কেউ সহানুভূতির অভিনয় করে, কেউ দামি উপহার বা চাকচিক্যময় জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে, কেউবা “আমি তোমাকে বুঝি” ধরনের আবেগী কথার জাল বুনে একজন ভেঙে পড়া মানুষকে নিজের দিকে টেনে নেয়। এভাবেই শুরু হয় বিপর্যয়ের পথচলা।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্বীকার করা জরুরি—পরকীয়া অবশ্যই ভুল। এটি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ পরকীয়া শুধু দুই ব্যক্তির গোপন সম্পর্ক নয়; এর অভিঘাত পড়ে পুরো পরিবারে, সন্তানদের মানসিক জগতে, আত্মসম্মানে, বিশ্বাসে এবং সামাজিক সম্পর্কের বুননে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, এই ভুলের বিচার করতে গেলে শুধু ফলাফল দেখে রায় দিলে চলবে না; দেখতে হবে তার পেছনের কারণ, প্রেক্ষাপট ও সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা অদৃশ্য ক্ষয়কেও।

আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো—আমরা সম্পর্কের জটিলতাকে সরলীকরণ করতে ভালোবাসি। পরকীয়ার ঘটনা ঘটলেই আমরা প্রশ্ন করি, “দোষ কার?” অথচ আরও জরুরি প্রশ্ন হতে পারত—“এই অবস্থায় পৌঁছানোর পেছনে কী কী কারণ কাজ করেছে?” একটি সংসার কখনো একা একজন মানুষ গড়ে তোলে না; এটি গড়ে ওঠে দুজনের সময়, মমতা, দায়িত্ব, ধৈর্য, ত্যাগ এবং পারস্পরিক সম্মানের ওপর। ফলে সেই সংসারে যখন ভাঙন ধরে, তখন সেটিকে কেবল একজনের নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে পূর্ণ সত্যটি ধরা পড়ে না।

আমি একথা বলতে চাই না যে, পরকীয়ায় জড়ানো ব্যক্তি দায়মুক্ত। না, যে এই পথে পা বাড়িয়েছে, সে অবশ্যই ভুল করেছে। সে নিজের সম্পর্ক, পরিবার এবং বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করেছে—এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এটাও কি সত্য নয় যে, অনেক সময় সেই ভুলের পেছনে সম্পর্কের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অবহেলা, অসম্মান, নীরবতা, আবেগের অনাহার এবং সঙ্গীর দায়িত্বহীনতাও কাজ করে? একজন মানুষ যদি বারবার নিজেকে অপ্রয়োজনীয়, অশ্রুত, অবহেলিত এবং একা মনে করেন, তবে তিনি ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়বেন—এটাই স্বাভাবিক। আর দুর্বলতার সেই মুহূর্তে যদি কেউ সামান্য সহানুভূতি, সামান্য মনোযোগ, সামান্য প্রশংসা বা সাময়িক আশ্রয়ের অনুভূতি দেয়, তবে ভুল পথে পা বাড়ানোর ঝুঁকি বেড়ে যায়।

তাই পরকীয়ার দায় এককভাবে শুধু নারী বা শুধু পুরুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে আমরা সমস্যার গভীরে পৌঁছাতে পারব না। বরং বলতে হবে, অনেক ক্ষেত্রেই এখানে দায় দুজনেরই—একজন সরাসরি ভুল করেন, আর অন্যজন হয়তো এমন এক শুষ্ক, অবহেলিত, যোগাযোগহীন সম্পর্কের পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে সেই ভুলের দিকে ঝুঁকে পড়া সহজ হয়ে যায়। এ কথার অর্থ এই নয় যে, ভুক্তভোগীকেও অপরাধীর কাতারে দাঁড় করানো হচ্ছে; বরং বলা হচ্ছে, সম্পর্কের সংকটকে বুঝতে হলে আমাদের আরও সৎ ও বাস্তববাদী হতে হবে। কারণ সম্পর্ক ভাঙে শুধু বিশ্বাসঘাতকতায় নয়; সম্পর্ক ভাঙে অবহেলায়, নীরবতায়, তুচ্ছতাচ্ছিল্যে, একে অপরকে না-শোনার অভ্যাসে, ছোট ছোট অপমানের পুনরাবৃত্তিতে এবং “ও তো আছেই” ধরনের নিশ্চিন্ত উদাসীনতায়।

মানুষ কেন পরকীয়ায় জড়ায়—তার উত্তর তাই বহুমাত্রিক। কেউ জড়ায় মানসিক আশ্রয়ের খোঁজে, কেউ স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়, কেউ দীর্ঘদিনের অবহেলার ক্ষত থেকে, কেউ একাকীত্বে, কেউ প্রতিশোধে, কেউ নিজের ভেঙে পড়া আত্মসম্মান সামলাতে, কেউবা নিছক সাময়িক মোহ, দম্ভ বা দায়িত্বহীন আবেগের বশে। অর্থাৎ সব পরকীয়ার কারণ এক নয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর শুরু শরীর দিয়ে নয়, মন দিয়ে। প্রথমে তৈরি হয় এক ধরনের আবেগীয় নির্ভরতা; তারপর ধীরে ধীরে সেটি জড়িয়ে ফেলে নৈতিকতা, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্ককে।

প্রশ্ন হলো, এই পথ থেকে বের হয়ে আসার উপায় কী?

প্রথমত, যিনি পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়েছেন, তাকে নিজের কাছে সত্য স্বীকার করতে হবে। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—এই সম্পর্ক কি আমাকে সত্যিকারের শান্তি দিচ্ছে, নাকি সাময়িক আবেগের মোহে আরও বড় অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই ধরনের সম্পর্ক শুরুতে আশ্রয় মনে হলেও পরে তা হয়ে ওঠে অপরাধবোধ, ভয়, গোপনতা, মানসিক অস্থিরতা এবং ভাঙনের উৎস। তাই পরকীয়া থেকে বের হওয়ার প্রথম শর্ত হলো—মরীচিকাকে মরীচিকাই হিসেবে চিনতে শেখা।

দ্বিতীয়ত, এই সম্পর্ক থেকে বের হতে হলে যোগাযোগের সীমানা টানতে হবে। যে মানুষটির সঙ্গে আবেগীয় জড়াজড়ি তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কথা, নিয়মিত যোগাযোগ, ব্যক্তিগত আলাপ, স্মৃতি রোমন্থন—এসব বন্ধ না করলে বের হওয়া সম্ভব নয়। “শুধু কথা বলছি” বা “শুধু বন্ধু হিসেবে আছি”—এ ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সম্পর্ক যদি ইতিমধ্যে আবেগের সীমা অতিক্রম করে থাকে, তবে সেখান থেকে সরে আসতে হলে দৃঢ় সিদ্ধান্তই একমাত্র পথ।

তৃতীয়ত, নিজের ভেতরের শূন্যতাকে চিহ্নিত করতে হবে। কেন এই দুর্বলতা তৈরি হলো? আমি কী খুঁজছিলাম? ভালোবাসা, সম্মান, মনোযোগ, না কি কেবল কেউ আমার কথা শুনুক—এই প্রশ্নগুলোর সৎ উত্তর খুঁজতে না পারলে মানুষ একই ভুলে বারবার ফিরে যায়। পরকীয়া থেকে বের হওয়া মানে শুধু একজন মানুষকে ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং নিজের ভেতরের ক্ষত, অভাব ও দুর্বলতার মুখোমুখি দাঁড়ানো।

চতুর্থত, বৈবাহিক সম্পর্কে সত্যিকারের কথোপকথন ফিরিয়ে আনতে হবে। অভিযোগ নয়, অপমান নয়, বরং পরিণত ও খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে বলতে হবে—কোথায় দূরত্ব তৈরি হয়েছে, কোন আচরণ কষ্ট দিচ্ছে, কী অভাব বোধ হচ্ছে, কীভাবে সম্পর্কটিকে পুনর্গঠন করা যায়। অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নিজের কষ্টে ডুবে থাকেন, কিন্তু কেউ কাউকে স্পষ্ট করে বলেন না—ফলে নীরবতা আরও গভীর হয়। অথচ সম্পর্ক বাঁচানোর জন্য প্রয়োজন সেই নীরবতা ভাঙা।

পঞ্চমত, একে অপরকে সময় দিতে হবে। সংসার কেবল খরচ চালানো, দায়িত্ব পালন বা সামাজিক পরিচয় রক্ষার নাম নয়; সংসার মানে সঙ্গ, মনোযোগ, আবেগের নিরাপত্তা, পারস্পরিক সম্মান এবং পাশে থাকার অনুভূতি। একসঙ্গে থেকেও যদি দুজন মানুষ আলাদা দ্বীপ হয়ে যান, তবে সেই দূরত্বই একসময় বাইরের কারও জন্য জায়গা তৈরি করে দেয়। তাই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে হলে নিয়মিত সময় দেওয়া, ছোট ছোট যত্ন, কৃতজ্ঞতার প্রকাশ, সঙ্গীর ভালো দিকগুলো স্বীকার করা এবং অভিমান জমতে না দেওয়া জরুরি।

ষষ্ঠত, প্রয়োজনে কাউন্সেলিং বা পারিবারিক পরামর্শ নেওয়া উচিত। আমাদের সমাজে এখনো অনেকেই মনে করেন, কাউন্সেলিং মানে দুর্বলতা। বাস্তবে এর ঠিক উল্টো। যখন দুজন মানুষ নিজেরা সমস্যার সমাধান করতে পারছেন না, তখন তৃতীয় একজন নিরপেক্ষ, দক্ষ ও সংবেদনশীল মানুষের সহায়তা অনেক সময় সম্পর্ককে নতুন দিশা দিতে পারে। সব ক্ষত একা সারানো যায় না; কখনো কখনো সাহায্য চাওয়াই পরিণত বোধের পরিচয়।

সবশেষে কথা হলো—পরকীয়া কোনো হালকা বিষয় নয়, আবার এটি কেবল “চরিত্রের সমস্যা” বলেও উড়িয়ে দেওয়ার মতো সরল নয়। এটি অনেক সময় ভেঙে পড়া সম্পর্কের নীরব আর্তনাদ, অমীমাংসিত অভিমান, অবহেলার দীর্ঘ ইতিহাস এবং মানসিক শূন্যতার বহিঃপ্রকাশ। তাই এর সমাধানও একপাক্ষিক দোষারোপে নেই। প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, পারস্পরিক দায় স্বীকার, সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা দূরত্বকে চিহ্নিত করা এবং সময় থাকতে তা মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া।

একটি সম্পর্ক টিকে থাকে না শুধু এক ছাদের নিচে থাকার কারণে; টিকে থাকে বোঝাপড়ায়, ভালোবাসায়, সহানুভূতিতে, সম্মানে, সময় দেওয়ায়, ভুল হলে তা স্বীকার করার সাহসে এবং ভেঙে পড়ার আগে একে অপরের দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মানবিকতায়। তাই পরকীয়ার বিচার করতে গেলে কেবল “কে দোষী”—এই প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না। বরং প্রশ্ন করতে হবে—কেন এমন হলো, কীভাবে এটি ঠেকানো যেত, এবং কীভাবে ভাঙনের ভেতর থেকেও মানুষ নিজেকে ও সম্পর্ককে উদ্ধার করতে পারে।

পরকীয়া তাই কেবল ব্যক্তির পাপ নয়; এটি প্রায়ই ভাঙা সম্পর্কের নীরব আর্তনাদ। আর সেই আর্তনাদ শুনতে না পারলে, দোষারোপের কোলাহলে আমরা কেবল মানুষ হারাব, সম্পর্ক হারাব, কিন্তু সমস্যার সমাধান খুঁজে পাব না।

 

লেখক পরিচিতিঃ

সাংবাদিক ও কলামিস্ট,

প্রচার ও প্রকাশনা সচিব,

কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ,

জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2019 TV Site
Design By BDit.com.bd