বৃষ্টি ও উজানের ঢলে সুনামগঞ্জে বন্যার শঙ্কা, প্রস্তুত ১,৩১১ আশ্রয়কেন্দ্র
অমিত তালুকদার, সুনামগঞ্জ।
১০ জুলাই ২০২৬
টানা বর্ষণ এবং ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জেলার কোনো নদী এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনও আগাম প্রস্তুতি জোরদার করেছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সিলেট বিভাগের প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে এবং কিছু স্থানে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি ছিল ৭ দশমিক ৩০ মিটার, যা বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার নিচে। গত ২৪ ঘণ্টায় এখানে পানি বেড়েছিল ১০ সেন্টিমিটার। একই সময়ে জেলায় ৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
ছাতক পয়েন্টে নদীর পানির উচ্চতা ছিল ৮ দশমিক ৩৮ মিটার, যা বিপৎসীমার ৩২ সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও একদিনে ২১ সেন্টিমিটার বেড়েছে। সেখানে ২৪ ঘণ্টায় ১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
অন্যদিকে শক্তিয়ারখলা পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ৭ দশমিক ২৮ মিটার, যা বিপৎসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার নিচে। যদিও এ পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টায় পানি ৪২ সেন্টিমিটার কমেছে। একই সময়ে লাউড়েরগড়ে সর্বোচ্চ ১০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
তবে বিকেল ৩টার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ পয়েন্টে পানির স্তর ৭ দশমিক ২৫ মিটারে নেমেছে, যা মৌসুমি বিপদসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার নিচে। গত ৬ ঘণ্টায় এখানে পানি ৫ সেন্টিমিটার কমেছে।
ছাতক পয়েন্টে পানির উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪০ মিটার, যা বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচে। তবে গত ৬ ঘণ্টায় এখানে পানি ২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।
শক্তিয়ারখলা পয়েন্টে পানির স্তর ৭ দশমিক ২২ মিটার, যা বিপদসীমার ৮৩ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। গত ৬ ঘণ্টায় সেখানে পানি ৬ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়েছে।
গত কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সুরমা, কুশিয়ারা, জাদুকাটা, রক্তি ও বৌলাইসহ জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিচু এলাকার অনেক স্থানে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে বন্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-২ মো. এমদাদুল হক বলেন, “নদ-নদীর পানির পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের পরিমাণের ওপর পানির প্রবণতা নির্ভর করবে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।”
জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমান জানান, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার ১১ উপজেলায় ১ হাজার ৩১১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া পর্যাপ্ত ত্রাণ, মেডিকেল টিম, স্বেচ্ছাসেবক, নৌযান ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী দুই দিন সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। ফলে সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।