1. shahinsalman99@gmail.com : Dhakar somoy : Dhakar somoy
  2. bditwork247@gmail.com : admin : Badhon Sarkar
  3. thedhakarsomoy@gmail.com : thedhakarsomoy :
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৫ অপরাহ্ন

পলাতক চেয়ারম্যানের ছায়া নিয়ন্ত্রণে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স

ক্রাইম রিপোর্টারঃ
  • আপডেটের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬
  • ৩৭ সময়

পলাতক চেয়ারম্যানের ছায়া নিয়ন্ত্রণে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স?

বোর্ডে অনলাইন উপস্থিতি, অনুমোদনহীন নেতৃত্ব, ক্লেইম জট ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তোলপাড়

ক্রাইম রিপোর্টারঃ

দেশের বেসরকারি খাতের নন-লাইফ বীমা কোম্পানি ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডকে ঘিরে বড় ধরনের প্রশাসনিক, আর্থিক ও করপোরেট সুশাসনবিরোধী অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কোম্পানিটির চেয়ারম্যান, সাবেক মেয়র ও সাবেক সংসদ সদস্য সাঈদ খোকন। জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়েরের পর দীর্ঘদিন ধরে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। তবে বিস্ময়করভাবে, আত্মগোপনে থাকলেও তিনি এখনো কোম্পানিটির চেয়ারম্যান পদে বহাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে কোম্পানির ভেতর-বাহিরের একাধিক সূত্রে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় দুই বছর ধরে চেয়ারম্যান সাঈদ খোকনকে কোম্পানির কার্যালয়ে দেখা যায় না। তিনি দেশে আছেন, নাকি বিদেশে—এমন প্রশ্নেরও সুস্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি কোম্পানির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। কিন্তু তার অনুপস্থিতি সত্ত্বেও কোম্পানির বোর্ড মিটিং, নীতিগত সিদ্ধান্ত, আর্থিক অনুমোদন এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর নিয়ন্ত্রণ অটুট রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ২৪ জুন ২০২৬ রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে অনুষ্ঠিত কোম্পানির সভায়—যেখানে লভ্যাংশ ঘোষণার বিষয়ও ছিল বলে জানা গেছে—সেখানে চেয়ারম্যান সাঈদ খোকন অনলাইনে যুক্ত হয়ে কার্যক্রমে অংশ নেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, একজন দীর্ঘদিন অনুপস্থিত, আত্মগোপনে থাকা এবং প্রকাশ্যে দায়িত্ব পালন না করা চেয়ারম্যান কীভাবে বোর্ড পরিচালনা করেন, আর এ ধরনের উপস্থিতি আদৌ কোম্পানি আইন, বীমা আইন ও নিয়ন্ত্রক নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ ইতোমধ্যে বীমা কোম্পানির পরিচালকদের বোর্ড ও কমিটির সভায় সশরীরে উপস্থিত থাকার নির্দেশনা দিয়েছে। একই সঙ্গে আইডিআরএর অনুমোদন ছাড়া কাউকে কার্যত সিইও হিসেবে বহাল রাখা বা “ইনচার্জ” ব্যবস্থায় অনির্দিষ্টকাল দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রক অবস্থান কঠোর করেছে। ফলে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে চেয়ারম্যানের অনলাইন অংশগ্রহণ, দীর্ঘ অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বোর্ডে উপস্থিত দেখানো, এবং ভারপ্রাপ্ত/অতিরিক্ত দায়িত্বে নেতৃত্ব চালানোর বিষয়গুলো এখন নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাঈদ খোকন দীর্ঘদিন সশরীরে কোনো বোর্ড সভায় অংশ না নিলেও সভার কার্যবিবরণীতে তাঁকে উপস্থিত দেখানো হচ্ছে এবং সেখানে তাঁর স্বাক্ষরও সংযুক্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, পরপর তিনটি বোর্ড সভায় কোনো পরিচালক অনুপস্থিত থাকলে তার পরিচালক পদ শূন্য হওয়ার প্রশ্ন তৈরি হতে পারে; সে ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকার বিষয়টিও আইনগত ও নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে—চেয়ারম্যান অনুপস্থিত, অথচ কর্তৃত্ব অটুট; বোর্ডে সিদ্ধান্ত হচ্ছে, কার্যবিবরণী তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সভার দৃশ্যমান স্বচ্ছতা বা সচিত্র উপস্থাপন অনুপস্থিত। এতে করে বোর্ড গভর্ন্যান্স, সিদ্ধান্তের বৈধতা এবং নথির সত্যতা—সবকিছু নিয়েই জোরালো সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কোম্পানির বর্তমান ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে। কোম্পানির সাবেক সিইও আব্দুল খালেক চাকরি হারানোর পর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মইনুল হাসান চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী/এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। অভিযোগ হচ্ছে, তাঁকে এখনো পূর্ণাঙ্গ এমডি বা সিইও হিসেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার যথাযথ অনুমোদন দেওয়া হয়নি; তবুও তিনি দীর্ঘ সময় ধরে কার্যত কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করছেন। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি আইডিআরএর অনুমোদনবিহীন ক্ষমতা প্রয়োগ, নাকি নিয়ন্ত্রক নজরদারির দুর্বলতার সুযোগ? আইডিআরএর সাম্প্রতিক নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, অনুমোদন ছাড়া কাউকে সিইও হিসেবে বসানো যাবে না, “অনগোয়িং চার্জ” বা “ইনচার্জ” টাইটেলে দায়িত্ব চালানো যাবে না; কেবল নির্দিষ্ট শর্তে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অস্থায়ীভাবে “চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার (অ্যাক্টিং)” হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে নেতৃত্বের বৈধতা ও অনুমোদনের বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতির সুযোগে কোম্পানির সিইও-সদৃশ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এবং কোম্পানি সেক্রেটারির একটি প্রভাবশালী বলয় প্রতিষ্ঠানে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করেছেন। এই বলয়ের বিরুদ্ধে আন্ডাররাইটিং অনিয়ম, আন্ডাররেটে ব্যবসা, কাভার নোট জালিয়াতি, অতিরিক্ত কমিশন দিয়ে ব্যবসা আনা, বাকিতে বীমা ব্যবসা করা, ভুয়া ক্লেইম সেটেলমেন্ট দেখানো, ভ্যাটের অর্থ পরিশোধ দেখিয়ে আত্মসাৎ, অস্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা ব্যয় এবং কোম্পানির অর্থ ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি, তবু কোম্পানির একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের দাবি—অনিয়মগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং দীর্ঘদিনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।

সূত্রগুলো বলছে, ঈদুল ফিতরের আগে ভুয়া বেতন-ভাতার বিল দেখিয়ে প্রায় ৪৮ লাখ টাকা ভাগবাটোয়ারা করা হয়; ওই অর্থের একটি অংশ চেয়ারম্যান ও কয়েকজন পরিচালককে ‘ঈদ বোনাস’ হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে প্রায় ২৬ লাখ টাকার একটি ভুয়া ক্লেইম সেটেলমেন্ট দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন ও তা পরিচালক-ম্যানেজমেন্টের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়; বরং শেয়ারহোল্ডার, পলিসিহোল্ডার ও বীমা খাতের সামগ্রিক সুশাসনের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে।

কোম্পানিটির বিরুদ্ধে আন্ডাররেটে বীমা ব্যবসার অভিযোগও কম গুরুতর নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, বড় গ্রাহকগোষ্ঠীর কিছু ব্যবসা নিয়মিতভাবে বাজারদরের নিচে আনা হয়; এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কমিশন ও কাভার নোটে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। এমনকি ১৩ কোটি টাকার একটি বীমা পলিসির বিপরীতে মাত্র ৩ কোটি টাকা প্রিমিয়াম গ্রহণ করে বাকি ১০ কোটি টাকা কমিশন সমন্বয় দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা মিললে তা বীমা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সলভেন্সি, রিজার্ভ ও আর্থিক প্রতিবেদন—সবকিছুকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে।

অন্যদিকে, সাধারণ গ্রাহকদের বীমা দাবির অর্থ পরিশোধে চরম গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে। কোম্পানির অনেক গ্রাহক মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ঘুরেও ন্যায্য ক্লেইম পাচ্ছেন না—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুনর্বীমা দাবির অর্থ বকেয়া, সাধারণ বীমা ক্লেইম ঝুলে থাকা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে গ্রাহকরা ক্ষুব্ধ হলেও, একই সময়ে চেয়ারম্যান সাঈদ খোকনের ব্যক্তিগত সম্পদ-সংশ্লিষ্ট ক্ষতির বিপরীতে ২০ কোটি টাকার একটি ক্লেইম সেটেলমেন্ট করা হয়েছে—এমন অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যদি এই অভিযোগের সত্যতা থাকে, তাহলে তা স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থবিরোধী আচরণের স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের গঠন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বোর্ডে চেয়ারম্যান হিসেবে সাঈদ খোকন এখনো বহাল। ভাইস চেয়ারম্যান ও উদ্যোক্তা পরিচালক পদে রয়েছেন নূর মোহাম্মদ, উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে আছেন ফারহানা সাঈদসহ একাধিক সদস্য। অভিযোগ রয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের বড় একটি অংশ চেয়ারম্যানের পরিবারের সদস্য কিংবা তাঁর প্রভাববলয়ের শেয়ারহোল্ডার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। ফলে বোর্ডে কার্যকর স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা দুর্বল হয়ে পড়েছে; চেয়ারম্যান পলাতক থাকলেও তাঁর ইচ্ছার বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবে সম্ভব হচ্ছে না। করপোরেট গভর্ন্যান্সের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গুরুতর ঝুঁকি, কারণ বোর্ড যদি কার্যত একটি পরিবারকেন্দ্রিক বা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক বলয়ে আবদ্ধ থাকে, তাহলে সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডার, সাধারণ পলিসিহোল্ডার এবং বাজারের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—আইডিআরএ কোথায়? বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইডিআরএর দায়িত্ব শুধু কাগুজে নির্দেশনা জারি করা নয়; বরং অভিযোগের সত্যতা যাচাই, বোর্ড সভার কার্যবিবরণী পরীক্ষা, চেয়ারম্যানের উপস্থিতি ও বৈধতা যাচাই, অনুমোদনহীন প্রধান নির্বাহী কাঠামো খতিয়ে দেখা, আন্ডাররাইটিং, কমিশন, ক্লেইম, ভ্যাট, পুনর্বীমা ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের ফরেনসিক অডিট করা, এবং প্রয়োজন হলে বোর্ড পুনর্গঠন, প্রশাসক নিয়োগ বা দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। বিশেষ করে ২৪ জুনের সভায় চেয়ারম্যানের অনলাইন অংশগ্রহণ, বোর্ডে তাঁর ভূমিকা, কার্যবিবরণীতে উপস্থিতি দেখানোর বৈধতা, এবং দীর্ঘদিন অননুমোদিত বা প্রশ্নবিদ্ধ নেতৃত্ব কাঠামো বহাল রাখার বিষয়গুলো এখনই তদন্ত করা জরুরি।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে কোম্পানির দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মো. মইনুল হাসান চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে জানা গেছে। ফলে কোম্পানির বক্তব্য এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে যেহেতু অভিযোগগুলো গুরুতর এবং এর সঙ্গে শেয়ারহোল্ডার, গ্রাহক ও পুরো বীমা খাতের স্বার্থ জড়িত, তাই বিষয়টি নিয়ে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত এখন সময়ের দাবি। ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটছে—পলাতক চেয়ারম্যানের ছায়া-শাসন, অনুমোদনহীন ব্যবস্থাপনা, নাকি সংঘবদ্ধ আর্থিক অনিয়মের এক অদৃশ্য চক্র—তার জবাব এখন আইডিআরএ ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকেই দিতে হবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2019 TV Site
Design By BDit.com.bd