
তারেক রহমানের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন: খালেদা জিয়ার জীবন-সঙ্কট, ‘ট্র্যাভেল পাস’ বিতর্ক ও ব্রিটিশ নিরাপত্তা বলয়ের টানাপোড়েন!
প্রধান বার্তা সম্পাদক ও প্রকাশক- জাহারুল ইসলাম জীবন এর এক অনুসন্ধানী বিশেষ প্রতিবেদন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দলের চেয়ারপার্সন ও তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়ার গুরুতর স্বাস্থ্য সঙ্কট, ব্রিটিশ সিটিজেনশিপ ও ‘ট্র্যাভেল পাস’ সংক্রান্ত আইনি বাধ্যবাধকতা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন- এই তিনটি প্রধান উপাদান একযোগে পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে।
১. খালেদা জিয়ার জীবন-সঙ্কট ও তারেক রহমানের মানবিক টানঃ- সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চিকিৎসাধীন আছেন। তিনি হৃদ্যন্ত্র, লিভার, কিডনি এবং ফুসফুসের জটিলতা নিয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় আছেন।
* গুজব ও সত্যঃ- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারেক রহমানের দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট তারিখ (আগামী ৪ তারিখে দুপুর ১২টা থেকে ৪টার মধ্যে) এবং বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুসংক্রান্ত গুজব ছড়িয়ে পড়লেও, বিএনপির পক্ষ থেকে তা কঠোরভাবে খণ্ডন করা হয়েছে। তিনি জীবিত আছেন এবং গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন।
* আন্তর্জাতিক নজরদারিঃ- তাঁর চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য ও চীন থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দল ঢাকায় এসেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে, তারেক রহমানের দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত মায়ের শারীরিক অবস্থার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। মায়ের অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে তিনি যেকোনো মুহূর্তে দেশে ফেরার মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
২. ‘ট্র্যাভেল পাস’ বনাম ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি জটিলতাঃ- তারেক রহমান একজন ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর দেশে ফেরার জন্য ‘ট্র্যাভেল পাস’-এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটি জটিল আইনি ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
* সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাসঃ- পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. এম এ মোমেনসহ সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, তারেক রহমান ট্র্যাভেল পাস চাইলে এক দিনের মধ্যে তা ইস্যু করা হবে এবং সরকার তাঁর দেশে ফেরা সহজ করতে প্রস্তুত। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাঁর ফিরতে কোনো আইনি বাধা নেই।
* আইন ও বিতর্কঃ- বিশ্লেষকদের মতে, একজন ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে ট্র্যাভেল পাস চাওয়া মানেই হলো তাঁর কাছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেই। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে দেশে নির্যাতনের আশঙ্কায় তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন, সেই দেশে ভ্রমণের জন্য এই ধরনের ডকুমেন্ট ব্যবহার করলে তাঁর রাজনৈতিক আশ্রয়ের বৈধতা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই বিষয়টি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের আইনি বাধ্যবাধকতার সৃষ্টি করেছে।
৩. নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রটোকলের জেরে দেশে ফেরার পথে অদৃশ্য বাধাঃ- তারেক রহমানের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে সামনে আসছে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং ব্রিটিশ সরকারের সুরক্ষা প্রটোকল।
* তারেক রহমানের বক্তব্যঃ- তারেক রহমান নিজেই জানিয়েছেন, “সংকটকালে মায়ের স্নেহ-স্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে,” কিন্তু “এখনই দেশে ফেরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তাঁর জন্য অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।”
* ব্রিটিশ সরকারের বিবেচনাঃ- রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাসহ অতীত রাজনৈতিক সহিংসতা বিবেচনা করে, ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (MI5) সম্ভবত নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট ও লিখিত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রটোকল চাইছে। সরকারিভাবে ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই’ বলা হলেও, ব্রিটিশ নিরাপত্তা বলয়ের এই প্রটোকলই তাঁর প্রত্যাবর্তনের পথে প্রধান ও অদৃশ্য বাঁধা হিসেবে কাজ করছে।
৪. রাজনৈতিক প্রভাবে শূন্যতা পূরণ ও মেরুকরণঃ- তারেক রহমানের দেশে ফেরা কেবল ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে বিবেচিত।
* নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণঃ- তাঁর অনুপস্থিতি বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়িয়েছে। তাঁর ফেরা দলের কর্মীদের মধ্যে বিপুল উদ্দীপনা ও গতিশীলতা আনবে এবং খালেদা জিয়ার অসুস্থতা সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করবে।
* আর্থ-সামাজিক অস্থিরতাঃ- তাঁর দেশে ফেরা-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং মায়ের অসুস্থতা নিয়ে তৈরি হওয়া গুঞ্জন সমাজে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সর্বোপরি, তারেক রহমানের দেশে ফেরা আপাতত অত্যন্ত অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি নির্ভর করছে তাঁর মায়ের স্বাস্থ্যের উন্নতি বা অবনতির ওপর এবং একই সাথে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাঁর নিরাপত্তার বিষয়ে চূড়ান্ত সবুজ সংকেত পাওয়ার ওপর। যতদিন না কূটনৈতিক ও আইনি চ্যানেলগুলো এই জটিলতার নিরসন করছে, ততদিন তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমসাময়িক বিষয় হিসেবে বজায় থাকবে।
Leave a Reply