
চরফ্যাশনে ইউএনও অফিসের নাজির সোহাগের ‘আলাদিনের চেরাগ’: কোটি টাকার সম্পদ ও নিয়োগ বাণিজ্যের পাহাড়।।
চরফ্যাশন (ভোলা)প্রতিনিধি।।
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের অফিস সহকারী (নাজির) মো. সোহাগের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক দুর্নীতি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই কর্মস্থলে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে জেঁকে বসা এই কর্মচারী পদের প্রভাব খাটিয়ে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। নামমাত্র বেতনের একজন কর্মচারী হয়েও বিলাসবহুল ভবন ও বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হওয়ায় জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
পৌরসভার কেন্দ্রবিন্দুতে বিলাসবহুল ভবন:
সরেজমিনে দেখা গেছে, চরফ্যাশন পৌরসভার প্রাণকেন্দ্র ৪নং ওয়ার্ডের ভদ্রপাড়ায় সোহাগ একটি চারতলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করছেন। ভবনের ঠিকাদার আলমগীর হোসেন জানান, গত ৫-৬ মাস ধরে এই কাজ চলছে। এছাড়া চরফ্যাশন সরকারি কলেজের সামনে ১০ শতাংশ জমি এবং বিএড কলেজ ও মুক্তাদির মোল্লা জামে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় তার একাধিক মূল্যবান প্লট রয়েছে বলে জানা গেছে।
৫ই আগস্ট পরবর্তী ‘চেয়ারম্যান নিয়োগ বাণিজ্য’:
গত ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর উপজেলার ২১টি ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যানরা আত্মগোপনে চলে গেলে নাজির সোহাগের ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ তুঙ্গে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, প্যানেল চেয়ারম্যানদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাইয়ে দিতে তিনি জনপ্রতি ৫ থেকে ৭ লক্ষ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছেন।
ভুক্তভোগী জিন্নাগড় ইউনিয়ন পরিষদের ৫নং ওয়ার্ড সদস্য আবু জাহের ফরাজী অভিযোগ করেন, “চেয়ারম্যান হওয়ার শর্তে আমি সোহাগকে নগদ ৫ লক্ষ টাকা দিয়েছি। এর মধ্যে ৩ লক্ষ টাকা দেওয়ার পর বাকি টাকা দিতে দেরি হওয়ায় তিনি স্থানীয়দের উসকানি দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিছিল করান এবং পদ বাতিলের ভয় দেখান। এখন টাকা ফেরত চাইলে তিনি গুন্ডা দিয়ে আমাকে অফিস থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন।”
সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়ম:
তদন্তে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের ভ্যাটের টাকা সরকারি ট্রেজারিতে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন সোহাগ। সরকারি নিয়মানুযায়ী ভ্যাট আইডি-তে টাকা জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি কোনো জমার রশিদ দেখাতে পারেননি। এছাড়া প্রভাব খাটিয়ে নিজের মামা-শ্বশুরকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের।
চরিত্র ও পারিবারিক বিতর্ক:
স্থানীয় যুবদল নেতা হান্নান মুনসীসহ এলাকাবাসীর অভিযোগ, সোহাগের চারিত্রিক রেকর্ডও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রথম স্ত্রী-সন্তান থাকা সত্ত্বেও তিনি এক প্রবাসীর স্ত্রীকে ভাগিয়ে এনে বিয়ে করেছেন এবং দুই স্ত্রীকে পৌরসভার দুটি আলাদা বিলাসবহুল বাড়িতে রেখেছেন।
অভিযুক্তের বক্তব্য:
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নাজির সোহাগ সব অস্বীকার করে বলেন, “আমার দুই ভাই প্রবাসী, তাদের পাঠানো টাকা দিয়েই আমি বাড়ি ও জমি কিনেছি।” তবে ভ্যাট চালানের রশিদের বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
প্রশাসনের নীরবতা:
তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নওরীন হক (বর্তমানে তেজগাঁও জরিপ অধিদপ্তরের চার্জ কর্মকর্তা) এর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ অবিলম্বে এই ‘দুর্নীতিবাজ’ কর্মচারীর অপসারণ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তার সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।
Leave a Reply