
যেকোনো মূল্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে
মানুষ কথা বলার অধিকার ফিরে পেতে চায়
একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই আমরা
তরুণরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবেন
দেশে ফিরে গণসংবর্ধনার মঞ্চে বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল বিকেলে রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কে।
সেই চেনা রাজপথ। চেনা মুখ, প্রিয় স্বজন। চেনা প্রকৃতি-পরিবেশে কিছুটা বদলে যাওয়া রেশ; কিন্তু তারেক রহমানের কাছে সেই ১৭ বছর পরও যেন অটুট বন্ধন, অমলিন সেই ভালোবাসা। সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে রাতজাগা পাখির মতো চোখ নিয়ে দেখলেন প্রিয় স্বদেশ।
বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেন। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি যেন তাঁকে কাবু করতে পারেনি! বরং মাটিতে পা দেওয়ার পরই অন্তরজুড়ে কী যে অদ্ভুত ভালো লাগা! অবশেষে তিনি ফিরলেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এবারের প্রত্যাবর্তন বীরের বেশে, রাজার মতো, মহাসমারোহে! কোটি মানুষের হৃদয়ে অনিঃশেষ ভালোবাসা জাগিয়ে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মূলমন্ত্রে সেই তিনি মানুষের কাছেই ফিরলেন। আর তাদেরই দিকে দুই হাত বাড়িয়ে খুলে দিলেন তাঁর আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের ছিপি।
মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো বলে উঠলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান।’ নাগরিকদের মনে পলকে উচ্ছ্বাস ছড়ানো আশা-জাগানিয়া এই বাণীই যেন আগামী দিনের বাংলাদেশ বিনির্মাণের রূপরেখা। গতকাল বৃহস্পতিবার লন্ডন থেকে দেশে ফিরে তারেক রহমান রাজধানীর পূর্বাচলে দেওয়া গণসংবর্ধনার জবাবে এভাবেই ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশা-নির্বিশেষে সবার সুন্দর জীবনের ছবি আঁকলেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের গতকালের বক্তব্যটি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু মেদহীন, পরিপাটি ও গোছানো।
সরল কিন্তু ইস্পাত-কঠিন প্রত্যয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বিনয়ের সঙ্গে তিনি দেশের সব মানুষের প্রতি সমান গুরুত্ব দিয়ে নিজের পরিশীলিত, শাণিত চিন্তার সব ভাবনা ও কল্পনার কথা তুলে ধরেন। অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আত্মবিশ্বাসী আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনাময় এই নেতা কথা বলেছেন, যেন প্রতিটি মানুষ নতুন এক তারেক রহমানকে দেখছে!
মঞ্চে উঠে তারেক রহমান উপস্থিত লাখ লাখ জনতার উদ্দেশে হাত নাড়েন। এরপর তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘প্রথমেই আমি রাব্বুল আল-আমিনের দরবারে হাজারো লক্ষ কোটি শুকরিয়া জানাতে চাই, রাব্বুল আল-আমিনের অশেষ রহমতে আজ আমি আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি, আপনাদের দোয়ায়, আপনাদের মাঝে।’
তিনি স্মরণ করলেন মার্টিন লুথার কিংকে, যাঁর অন্যতম সেরা ভাষণের একটি উক্তি হলো, ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম।
যেখানে লুথার কিং শিশুদের নিয়ে স্বপ্ন, একতার স্বপ্ন এবং স্বাধীনতার স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। এর আদলে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনাদের সবার সামনে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সদস্য হিসেবে আপনাদের সামনে আমি বলতে চাই, আই হ্যাভ আ প্ল্যান, ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি। এই পরিকল্পনা দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য। যদি সেই প্ল্যান, সেই কার্যক্রম, সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে হয় তাহলে এই জনসমুদ্রে যত মানুষ উপস্থিত আছেন, সারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শক্তি যত মানুষ উপস্থিত আছেন, প্রত্যেকটি মানুষের সহযোগিতা আমার লাগবে।’
যেকোনো মূল্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহবান জানিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা যে ধর্মের মানুষ হই, যে শ্রেণির মানুষ হই, যে দলেরই রাজনৈতিক দলের সদস্য হই, অথবা একজন নির্দলীয় ব্যক্তি হই, আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, যেকোনো মূল্যে আমরা আমাদের এই দেশের শান্তি-শৃঙ্খলাকে ধরে রাখতে হবে। যেকোনো মূল্যে যেকোনো বিশৃঙ্খলাকে পরিত্যাগ করতে হবে। যেকোনো মূল্যে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ নিরাপদ থাকতে পারে। শিশু হোক, নারী হোক, পুরুষ হোক, যেকোনো বয়স, যেকোনো শ্রেণি, যেকোনো পেশা, যেকোনো ধর্মের মানুষ যেন নিরাপদ থাকে—এই হোক আমাদের চাওয়া আজকে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল। ঠিক একইভাবে পঁচাত্তরে আবার ৭ নভেম্বর আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে রক্ষার জন্য সেদিন সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আধিপত্যবাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা হয়েছিল। একইভাবে পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এ দেশের জনগণ, এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ছিনিয়ে এনেছিল। কিন্তু তার পরও ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। আমরা তারপর দেখেছি ১৯৭১ সালে এই দেশের মানুষ যেমন স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, ২০২৪ সালে এ দেশের ছাত্র-জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষ—কৃষক, শ্রমিক, গৃহবধূ, নারী-পুরুষ, মাদরাসার ছাত্রসহ দল-মত-নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সেদিন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল।’
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কথা বলার অধিকার ফিরে পেতে চায়। তারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে চায়। বাংলাদেশের মানুষ চায়, তারা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ন্যায্য অধিকার পাবে।
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের সময় এসেছে সবাই মিলে দেশ গড়ার। এই দেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে, এই দেশে একইভাবে সমতলের মানুষ আছে। এই দেশে মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে। আমরা চাই, সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব আমরা, যেই বাংলাদেশের স্বপ্ন একজন মা দেখেন, অর্থাৎ একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই। যে বাংলাদেশে একজন নারী, একজন পুরুষ, একজন শিশু যে-ই হোক না কেন, নিরাপদে ঘর থেকে বের হলে নিরাপদে ইনশাআল্লাহ ঘরে আবার ফিরে আসতে পারে।’
অন্য যেকোনো জনসমাবেশ থেকে ভিন্ন-ব্যতিক্রম এই সংবর্ধনায় শীর্ষ নেতাদের দল বেঁধে বক্তৃতা দেওয়ার কোনো আয়োজন ছিল না। যেন নেতার কথাই সবাই শোনার জন্য উদগ্রীব। তাই তো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মানুষ যা জানতে চায়, যা শুনে শান্ত হতে চায়, তা-ই বলেছেন আপন মনে।
তারেক রহমান বলেন, ‘এই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, চার কোটিরও বেশি তরুণ প্রজন্মের সদস্য, পাঁচ কোটির মতো শিশু, ৪০ লাখের মতো প্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছেন, কয়েক কোটি কৃষক-শ্রমিক রয়েছেন। আমরা যদি সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই তাহলে আমরা এই লক্ষ-কোটি মানুষের সেই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারি, ইনশাআল্লাহ। ১৯৭১ সালে আমাদের শহীদরা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এই রকম একটি বাংলাদেশ গঠনের জন্য। বিগত ১৫ বছর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলায় শত শত হাজারো গুম-খুনের শিকার হয়েছে শুধু রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, নিরীহ মানুষও প্রতিবাদ করতে গিয়ে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছে, জীবন দিয়েছে। ২০২৪ সাল, মাত্র সেদিনের ঘটনা। আমরা দেখেছি, আমাদের তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা কিভাবে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে দেশের এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার জন্য।’
তারেক রহমান ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদির কথা স্মরণ করে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে এই বাংলাদেশের চব্বিশের আন্দোলনের এক সাহসী প্রজন্মের এক সাহসী সদস্য ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। ওসমান হাদি শহীদ হয়েছে। ওসমান হাদি চেয়েছিল এই দেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক। এই দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। এই দেশের মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে পাক। আজ চব্বিশের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছে ওসমান হাদিসহ, ১৯৭১ সালে যারা শহীদ হয়েছে, বিগত স্বৈরাচারের সময় বিভিন্নভাবে খুন-গুমের শিকার হয়েছে, এই মানুষগুলোর রক্তের ঋণ যদি শোধ করতে হয়, আসুন আমরা আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলব।’
তরুণরাই আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের যে সদস্যরা আছেন আপনারাই আগামী দিনে দেশকে নেতৃত্ব দেবেন, দেশকে গড়ে তুলবেন। এই দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের সদস্যদের আজ গ্রহণ করতে হবে, যাতে করে এই দেশকে আমরা সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারি শক্ত ভিত্তির ওপরে। গণতান্ত্রিক ভিত্তি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপরে, যাতে এই দেশকে আমরা গড়ে তুলতে পারি।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে এই দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশিত সেই বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলতে চাই। আমাদের যেকোনো মূল্যে, যেকোনো মূল্যে আমাদের এই দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে। যেকোনো উসকানির মুখে আমাদের ধীর ও শান্ত থাকতে হবে। আমরা দেশের শান্তি চাই। আমরা দেশের শান্তি চাই। আমরা দেশে শান্তি চাই।’
তিনি বলেন, ‘আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি, ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা আসবে, আমরা সবাই নবী করিম (সা.)-এর যে ন্যায়পরায়ণতা, সেই ন্যায়পরায়ণতার আলোকে আমরা দেশ পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’
নিজের মায়ের ত্যাগের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারা জানেন, এখান থেকে আমি আমার মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে যাব। যে মানুষটি এই দেশের মাটি, এই দেশের মানুষকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন, তাঁর সঙ্গে কী হয়েছে আপনারা প্রত্যেকটি মানুষ সে সম্পর্কে অবগত আছেন। সন্তান হিসেবে আপনাদের কাছে আমি চাইব, আল্লাহর দরবারে আপনারা দোয়া করবেন, যাতে আল্লাহ উনাকে তৌফিক দেন, উনি যাতে সুস্থ হতে পারেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘সন্তান হিসেবে আমার মন আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে, সেই হাসপাতালের ঘরে। কিন্তু সেই মানুষটি যাদের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, অর্থাৎ আপনারা, এই মানুষগুলোকে, যাদের জন্য দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই মানুষগুলোকে আমি কোনোভাবেই ফেলে যেতে পারি না। সে জন্যই আজ হাসপাতালে যাওয়ার আগে আপনাদের প্রতি, যাঁরা সমগ্র বাংলাদেশে আমাকে দেখছেন, আপনাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আজ আমি এখানে দাঁড়িয়েছি।’
সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আপনাদের সবার কাছে দোয়া চেয়ে, আবারও সবাইকে যেকোনো মূল্যে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার আহবান জানিয়ে, যেকোনো বিশৃঙ্খলাকে পরিহার করে, ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলা করার আহবান জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি।’
অভ্যর্থনা মঞ্চে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এবং শরিক দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply