
কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এসএমসি নির্বাচন নিয়ে অনিয়ম ও
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা অভিযোগ
মোঃজোনায়েদ হোসেন জুয়েল
স্টাফ রিপোর্টার, কিশোরগঞ্জ
কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি) এর অভিভাবক সদস্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়ম, অস্বচ্ছতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় একজন প্রার্থীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা, মনোনয়নপত্র বাতিলের তথ্য গোপন রাখা, বিধি অনুযায়ী আপিলের সুযোগ না দেওয়া এবং পরবর্তীতে অপমানজনক বার্তা পাঠানোর অভিযোগে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগকারী মোঃ জোনায়েদ হোসেন জুয়েল, যিনি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহাদি হোসেন আবাদ (রোল নং-৮)-এর অভিভাবক। তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য নির্বাচনকে ঘিরে শুরু থেকেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব ছিল এবং পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া একটি বিশেষ পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে বলে তার ধারণা।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বিতরণের নির্ধারিত তারিখ ছিল ১৮ ও ১৯ মে। কিন্তু নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে সকল অভিভাবকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়নি। অভিযোগকারীর দাবি, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পরিবর্তে শুধুমাত্র একদিন ১৯ই মে ফরম বিতরণ কার্যক্রম সীমিত সংখ্যক ব্যক্তিকে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক আগ্রহী অভিভাবক মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সুযোগই পাননি।
জোনায়েদ হোসেন জুয়েল জানান, তিনি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ৩০০ টাকা ফি জমা দিয়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন এবং যথাসময়ে তা পূরণ করে জমা দেন। পরে অন্যান্য প্রার্থীদের মাধ্যমে জানতে পারেন যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা জমা দিতে হচ্ছে। বিষয়টি জানার পর তিনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে সেই অর্থও জমা দেন। তবে অর্থ গ্রহণের সময় কিংবা এর আগে কোনো পর্যায়ে তাকে জানানো হয়নি যে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
তার অভিযোগ, পরবর্তীতে নির্বাচন বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাকে মৌখিকভাবে জানান যে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। কিন্তু কী কারণে বাতিল হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এমনকি নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী আপিল করার যে সুযোগ রয়েছে, সে বিষয়েও তাকে অবহিত করা হয়নি।
অভিযোগকারী দাবি করেন, একজন প্রার্থী হিসেবে তিনি ন্যায্য প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তার মতে, যদি কোনো কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিল তাকে লিখিতভাবে কারণ জানানো এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিলের সুযোগ দেওয়া। কিন্তু কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই তাকে নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা নির্বাচন বিধির পরিপন্থী।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচনকে প্রভাবিত করে একটি নির্দিষ্ট পক্ষের অনুকূলে পরিচালনা কমিটি গঠনের চেষ্টা করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে পরিকল্পিতভাবে নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে এবং একটি পূর্বনির্ধারিত কমিটি গঠনের লক্ষ্যে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে।
এদিকে বিদ্যালয়ের কয়েকজন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রধান শিক্ষকের একক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, এসএমসি নির্বাচনেও সেই প্রভাব ব্যবহার করে পছন্দের ব্যক্তিদের নির্বাচিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ কারণে অনেক অভিভাবকের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগকারী আরও উল্লেখ করেন, নির্বাচন সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন তোলার পর প্রধান শিক্ষক তার মোবাইল ফোনে একটি বার্তা পাঠান, যা তিনি অপমানজনক ও অসম্মানজনক বলে মনে করেন। তিনি বলেন, একজন অভিভাবক হিসেবে বিদ্যালয়ের বিষয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার তার রয়েছে। কিন্তু তার সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উল্টো এমন আচরণ করা হয়েছে, যা তাকে মানসিকভাবে কষ্ট দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি নির্বাচন নিয়ে এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাদের মতে, বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন, শিক্ষার পরিবেশ এবং অভিভাবকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে একটি গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচন অপরিহার্য। তাই অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, “আজকে অভিযোগটি পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
সচেতন মহলের দাবি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি নির্বাচনকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অবশ্যই স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও প্রশ্নাতীত রাখতে হবে।