দক্ষিণাঞ্চলের সাড়াজাগানো তারুণ্যের কবি-রবি ডাকুয়ার কবিতা
এখনই থেমে গেলে কেন, কমরেড
-ম. ম. রবি ডাকুয়া
এখনই থেমে গেলে কেন, কমরেড?
মানুষের এখন তো কম রেট—
খুব সস্তা অবস্থা!
একটা দীর্ঘশ্বাসের চেয়েও
এখন মানুষের জীবনের দাম কম।
একটা মিথ্যা প্রতিশ্রুতির নিচে
চাপা পড়ে থাকে
সহস্র মানুষের শ্রম।
ক্ষমতাবানের কলমের খোঁচায়
বদলে যায় হাজার পরিবারের ভবিষ্যৎ।
আর একটা গুলির শব্দে
রাষ্ট্র শিখে নেয়—
কীভাবে নীরব করতে হয়
একটি প্রতিবাদী কণ্ঠ!
তবু বলো, কমরেড,
এখনই থেমে গেলে কেন?
তোমার হাতে যে পতাকা,
তার লাল রং কি শুধু কাপড়ের?
তার ভেতরে কি নেই
ক্ষুধার্ত মায়ের চোখ,
শ্রমিকের রক্তমাখা দুপুর,
কৃষকের ফেটে যাওয়া পায়ের চামড়া,
বেকার যুবকের বুকের ভেতর
জমে থাকা আগুন?
তোমার মুষ্টিবদ্ধ হাতের ভেতর
যে সামান্য আকাশ,
সেটুকুও কি বিক্রি করে দেবে
দুই মুঠো ভাতের বিনিময়ে?
না, কমরেড,
এভাবে থামতে নেই!
পৃথিবী এখন এমন এক বাজার,
যেখানে মানুষের দুঃখেরও দরদাম হয়।
বিবেক বিক্রি হয় কিস্তিতে,
সত্যকে দাঁড় করানো হয় কাঠগড়ায়,
আর মিথ্যা—
ক্ষমতার রাজকীয় পোশাক পরে
রাজপথ থেকে সংসদ পর্যন্ত
বীরদর্পে হেঁটে যায়।
এখানে ক্ষুধার্ত মানুষ
রুটির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে
সন্তানের মুখ মনে করে।
আর মুনাফাখোরেরা
খাদ্যশস্যের গুদামে তালা লাগিয়ে
লাভের হিসাব মেলায়।
এখানে শ্রমিকের ঘামে
কারখানার চাকা ঘোরে,
অথচ শ্রমিকের ঘরে
চুলা জ্বলে না প্রতিদিন।
এখানে কৃষক ফসল ফলায়,
কিন্তু ন্যায্য দাম পেতে
তাকে নিজের ভাগ্য বিক্রি করতে হয়।
এখানে শিক্ষিত যুবক
সনদের ফাইল বুকে চেপে
দরজায় দরজায় ঘোরে।
আর অযোগ্যতার কপালে
ক্ষমতার আশীর্বাদ এঁকে
চাকরির চেয়ার সাজিয়ে রাখা হয়।
বলো, কমরেড,
এই পৃথিবীকে কি পৃথিবী বলা যায়?
যেখানে মানুষ বেঁচে থাকে,
কিন্তু মানুষের মতো
বাঁচতে পারে না!
যেখানে স্বাধীনতার গান বাজে,
কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকার
প্রতিদিন অনুমতি চায়!
তুমি কি সেই পৃথিবীর কাছে
তোমার শেষ শব্দটুকুও
বন্ধক রাখবে?
এখনই থেমে গেলে কেন, কমরেড?
তোমার তো থামার কথা ছিল না!
মাথা নত করার কথা ছিল না!
তোমার তো জানা ছিল—
ইতিহাস কখনো
আরামের বিছানায় শুয়ে
লেখা হয় না।
ইতিহাসের প্রতিটি অক্ষরের নিচে
কেউ না কেউ
নিজের জীবন রেখে যায়।
কেউ কারাগারের অন্ধকারে
স্বপ্নের নাম ধরে ডাকে।
কেউ নির্বাসনের দীর্ঘ পথে
নিজের দেশের মাটি
খুঁজে ফেরে।
কেউ পরাজয়ের ভেতর দাঁড়িয়ে
বিজয়ের ভাষা আবিষ্কার করে।
তুমি তো জানো,
সূর্য কোনো শাসকের সম্পত্তি নয়,
আকাশ কোনো অভিজাতের কেনা জমি নয়,
নদী কোনো দখলদারের দলিল নয়।
আর মানুষের জন্ম—
কোনো ক্ষমতাবানের
দয়ার দান নয়!
তাহলে কেন
নিজের অধিকার চাইতে গিয়ে
নিজেকেই অপরাধী ভাবছ?
কেন তোমার কণ্ঠে
এত দীর্ঘ নীরবতার শেকল?
কেন তোমার চোখের আগুনে
এত ক্লান্ত ছাই?
কমরেড,
তোমার ভেতরে কি তবে
সব বিদ্রোহ শেষ হয়ে গেছে?
তোমার বুকের পাঁজরে
যে বজ্রপাত একদিন
অন্যায়ের দেয়াল কাঁপিয়ে দিত,
আজ সে কেন
নিজের হৃদয়েই নির্বাসিত?
না কি তুমিও শিখে গেছ—
কীভাবে অন্যায়ের পাশে বসে
ন্যায়ের কবিতা লিখতে হয়?
কীভাবে ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে
সমৃদ্ধির বক্তৃতা দিতে হয়?
কীভাবে মৃত বিবেকের কাঁধে হাত রেখে
জীবন্ত মানুষের শোক পালন করতে হয়?
যদি তাই হয়,
তবে তোমার লাল পতাকা
আজ বাতাসের কাছে
ক্ষমা চায়!
আমি জানি, কমরেড,
পৃথিবী তোমাকে সহজে
জায়গা দেবে না।
তোমার জন্য রাজপথে
ফুল বিছানো থাকবে না।
তোমার নামে উৎসবের আলো
জ্বলবে না প্রতিটি জানালায়।
তোমার উচ্চারণে
ক্ষমতাবানেরা হাততালি দেবে না।
তারা তোমাকে বলবে—
উচ্ছৃঙ্খল,
অবাস্তব,
অপরিণত,
সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে
না-পারা এক মানুষ।
তোমার বন্ধুরা বলবে,
এখন এসব করে কী হবে?
সময় বদলেছে, কমরেড!
এখন বিপ্লবের চেয়ে
ব্যক্তিগত উন্নতি জরুরি।
মানুষের অধিকারের চেয়ে
নিজের ঘর সামলানো জরুরি।
অন্যায়ের প্রতিবাদের চেয়ে
নিজের নিরাপত্তা জরুরি।
তুমি তখন কী বলবে?
বলবে কি—
আমি চোখ বন্ধ করে রাখব,
যাতে অন্যায় আমাকে
দেখতে না পায়।
আমি কান বন্ধ করে রাখব,
যাতে আর্তনাদ
আমার ঘুম না ভাঙায়।
আমি মুখ সেলাই করে রাখব,
যাতে সত্য উচ্চারণের দায়
আমার কাঁধে না পড়ে!
না, কমরেড!
এমন সমঝোতার নাম জীবন নয়।
এ তো ধীরে ধীরে
নিজের ভেতর থেকে
নিজেকেই হত্যা করা!
আমি এমন জীবন চাই না,
যে জীবন মাথা উঁচু করতে ভয় পায়।
আমি এমন শান্তি চাই না,
যে শান্তির নিচে চাপা পড়ে থাকে
হাজার মানুষের কান্না।
আমি এমন উন্নয়ন চাই না,
যার চকচকে সড়কের পাশে
ক্ষুধার্ত শিশুরা
ডাস্টবিনে ভবিষ্যৎ খুঁজে বেড়ায়।
আমি এমন রাষ্ট্র চাই,
যেখানে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়।
যেখানে শ্রমের মর্যাদা
বংশপরিচয়ের কাছে হেরে যায় না।
যেখানে বিচার পেতে
মানুষকে ক্ষমতার দরজায়
আত্মসম্মান জমা রাখতে হয় না।
আমি এমন পৃথিবী চাই,
যেখানে মানুষের পরিচয়
সম্পদে কিংবা আনুগত্যে
সীমাবদ্ধ নয়।
যেখানে মানুষের প্রথম পরিচয়—
সে মানুষ!
কিন্তু এই পৃথিবী
কেউ এসে আমাদের হাতে
তুলে দেবে না, কমরেড।
এই পৃথিবী তৈরি করতে হবে
প্রশ্ন দিয়ে,
যুক্তি দিয়ে,
সংগঠিত প্রতিবাদ দিয়ে,
নৈতিক সাহস দিয়ে।
তোমার বিদ্রোহ মানে
কেবল মুষ্টি উঁচিয়ে চিৎকার নয়।
তোমার বিদ্রোহ মানে
নিজের ভেতরের সুবিধাবাদী মানুষটিকে
প্রতিদিন পরাজিত করা।
তোমার বিপ্লব মানে
শুধু ক্ষমতার চেয়ার বদল নয়।
তোমার বিপ্লব মানে
ক্ষমতার চরিত্র বদলানোর লড়াই।
তোমার লাল পতাকা মানে
শুধু একটি রাজনৈতিক পরিচয় নয়।
তার অর্থ—
বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার,
নিপীড়িতের কথা শোনার সাহস,
পরাজিত মানুষের ভেতর
সম্ভাবনার আলো জ্বালিয়ে রাখার
প্রতিজ্ঞা।
কমরেড,
মনে রেখো—
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষটি
সব সময় জয়ী হয় না।
কিন্তু তার নীরবতা
অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে।
সত্য উচ্চারণকারী মানুষটি
সব সময় সম্মান পায় না।
কিন্তু তার ভয়
মিথ্যাকে সিংহাসন উপহার দেয়।
আর যে মানুষ
নিজের স্বার্থের বাইরে
অন্য মানুষের কান্না শুনতে পায়,
তার পরাজয়ও
ইতিহাসের কাছে এক ধরনের বিজয়।
তাই বলছি,
এখনই থেমে গেলে কেন, কমরেড?
দেখো,
রাস্তার ওপারে যে বৃদ্ধটি
সারাদিন রিকশা চালিয়ে
রাতে ওষুধের টাকা গুনছে,
তার কাঁপা আঙুলে
এখনো লেখা আছে
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
মানুষের জীবনের দাম কত?
দেখো,
যে মা সন্তানের স্কুলের বেতন দিতে না পেরে
পুরোনো শাড়ির আঁচলে
মুখ লুকায়,
তার অশ্রুর মধ্যে
একটি রাষ্ট্রের সব উন্নয়ন-পরিসংখ্যান
অর্থহীন হয়ে যায়।
দেখো,
যে তরুণ চাকরি না পেয়ে
ঘরের জানালা বন্ধ করে
অন্ধকারের সঙ্গে কথা বলে,
তার নীরবতার ভেতর
একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ
প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
দেখো,
যে শ্রমিক দুর্ঘটনার পর
ক্ষতিপূরণের আশায়
অফিসের সিঁড়িতে বসে থাকে,
তার ক্ষতবিক্ষত শরীর
স্পষ্ট করে বলে—
এই সভ্যতা কার জন্য?
তাদের দিকে তাকাও, কমরেড।
তাদের চোখে চোখ রাখো।
তাদের বলো না,
সব ঠিক হয়ে যাবে।
কারণ মিথ্যা আশ্বাস
ক্ষুধার্ত মানুষের
পেট ভরায় না।
তাদের বলো—
আমরা অন্যায়কে
স্বাভাবিক বলে মেনে নেব না।
মানুষের মর্যাদাকে
বাজারের পণ্যে পরিণত হতে দেব না।
প্রশ্ন করার অধিকার
ভয়ের কাছে বিক্রি করব না।
আমরা ভুল করব,
পরাজিত হব,
পথে বিভ্রান্তি আসবে।
আমাদের ভেতরেও
স্বার্থপরতা মাথা তুলবে।
তবু আমরা প্রশ্ন করব,
নিজেদের সংশোধন করব,
মানুষের কাছে জবাবদিহি করব।
কারণ বিদ্রোহের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা
শত্রুর সামনে দাঁড়ানো নয়,
নিজের ভুলের সামনে দাঁড়ানো।
কমরেড,
তুমি কি জানো,
সবচেয়ে ভয়ংকর কারাগার কোনটি?
লোহার শিক নয়,
অন্ধকার কুঠুরিও নয়,
নির্বাসনের দীর্ঘ পথও নয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর কারাগার—
যেখানে মানুষ নিজের শৃঙ্খলকে
অলংকার বলে ভাবতে শেখে।
নিজের অপমানকে
ভাগ্য বলে মেনে নেয়।
নিজের পরাজয়কে
যোগ্যতার অভাব বলে ব্যাখ্যা করে।
আর অন্যের শোষণকে
সমাজের চিরন্তন নিয়ম ভাবে।
সেই কারাগারের দেয়াল
ভাঙতে হাতুড়ি লাগে না।
লাগে একটি প্রশ্ন,
একটি সাহসী উচ্চারণ,
একটি জেগে ওঠা বিবেক।
তুমি সেই প্রশ্নটি করো, কমরেড!
প্রশ্ন করো—
কেন শ্রমিকের ঘাম সস্তা,
অথচ তার শ্রমে তৈরি পণ্যের
দাম এত বেশি?
কেন কৃষকের ফসলের মূল্য কম,
অথচ মধ্যস্বত্বভোগীর মুনাফা
বাড়তেই থাকে?
কেন মানুষের অধিকার
কাগজে এত উজ্জ্বল,
অথচ বাস্তবে এত অন্ধকার?
কেন সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষ
এত একা হয়ে যায়?
কেন ক্ষমতার কাছে
মানুষের কান্না পৌঁছাতে
এতগুলো দরজা পেরোতে হয়?
প্রশ্ন করো,
যতক্ষণ প্রশ্নের প্রয়োজন আছে।
কিন্তু প্রশ্নকে
ঘৃণার অস্ত্র বানিয়ো না।
প্রতিবাদকে
প্রতিহিংসায় পরিণত কোরো না।
কারণ তুমি যে পৃথিবী গড়তে চাও,
সেই পৃথিবীতে
মানুষের মুক্তি চাই,
মানুষের বিনাশ নয়।
বিদ্রোহের আগুন
অন্যায়ের অন্ধকার পোড়াবে,
মানুষের ঘর নয়।
প্রতিবাদের কণ্ঠ
মিথ্যার মুখোশ খুলবে,
মানুষের মুখ নয়।
তোমার লড়াই
কোনো জাতির বিরুদ্ধে নয়,
কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়,
কোনো অসহায় মানুষের বিরুদ্ধে নয়।
তোমার লড়াই
মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা
শোষণ, বৈষম্য ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে।
তাই তোমার হাত শক্ত করো, কমরেড,
কিন্তু হৃদয়কে পাথর কোরো না।
তোমার কণ্ঠ উঁচু করো,
কিন্তু বিবেককে নীরব কোরো না।
তোমার পদক্ষেপ দৃঢ় করো,
কিন্তু সত্যকে পেছনে ফেলে যেয়ো না।
কারণ পতাকা উঁচু রাখার চেয়েও
পতাকার অর্থ অক্ষুণ্ণ রাখা কঠিন।
স্লোগান দেওয়ার চেয়েও
স্লোগানের সত্যকে
নিজের জীবনে ধারণ করা কঠিন।
তুমি যদি মানুষের মুক্তির কথা বলো,
মানুষের প্রশ্নকেও সম্মান করো।
তুমি যদি সাম্যের কথা বলো,
নিজের ভেতরের বৈষম্যকে চিনতে শেখো।
তুমি যদি ন্যায়ের কথা বলো,
নিজের পক্ষের অন্যায়কেও
অন্যায় বলতে শেখো।
নইলে তোমার বিপ্লব
পুরোনো সিংহাসনে
নতুন নামের ফলক হয়ে থাকবে।
শাসকের পোশাক বদলাবে,
কিন্তু মানুষের দীর্ঘশ্বাস বদলাবে না।
আর সেই দীর্ঘশ্বাসের কাছে
তোমার সমস্ত বক্তৃতা
একদিন পরাজিত হবে!
কমরেড,
তোমার কি মনে পড়ে—
একদিন তুমি বলেছিলে,
মানুষের পৃথিবী
মানুষই বদলাবে?
তবে আজ এত ক্লান্ত কেন?
কেন তোমার চোখে
পরাজয়ের এত দীর্ঘ ছায়া?
কেন তোমার কণ্ঠে
অন্যায়ের চেয়ে
নিজের নিরাপত্তার হিসাব বেশি?
তুমি কি তবে ভুলে গেছ—
বীজ মাটির নিচে থাকলেও
পরাজিত হয় না।
অন্ধকার ঘনালেও
ভোরের সম্ভাবনা নিঃশেষ হয় না।
একটি প্রদীপ ঝড়ের মুখে কাঁপলেও
তার সামান্য আলো
অন্ধকারের সাম্রাজ্যকে
চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।
তুমি প্রদীপ হও, কমরেড,
কিন্তু একা জ্বলেই
সব শেষ ভেবো না।
আরও প্রদীপ জ্বালাও,
আরও মানুষকে পড়তে শেখাও,
আরও মানুষকে ভাবতে শেখাও,
আরও মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাও।
মানুষকে শুধু অনুসারী কোরো না,
সচেতন নাগরিক হতে সাহায্য করো।
শুধু স্লোগান দিও না,
সত্য যাচাই করার শক্তি দাও।
শুধু ক্রোধ শেখাও না,
ন্যায় প্রতিষ্ঠার ধৈর্যও শেখাও।
কারণ অন্ধ আনুগত্য
যেকোনো পতাকাকেই
একদিন শৃঙ্খলে পরিণত করতে পারে।
আর মুক্তবুদ্ধি
মানুষকে নিজের মুক্তির
নির্ভরযোগ্য সহযাত্রী করে তোলে।
আজ মানুষের দাম কম, কমরেড,
তাই মানুষের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার
দায় আরও বেশি।
আজ সত্যের কণ্ঠ দুর্বল,
তাই সত্য উচ্চারণের
প্রয়োজন আরও বেশি।
আজ প্রতিবাদের পথ কঠিন,
তাই ন্যায়ের পক্ষে
সংগঠিত থাকার প্রয়োজন আরও বেশি।
আজ মানুষ মানুষকে ভয় পায়,
তাই মানুষের পাশে
মানুষ হয়ে দাঁড়ানোর
প্রয়োজন আরও বেশি।
মানুষের দাম কমে গেছে বলে
মানুষকে সস্তা ভেবো না, কমরেড।
বাজারের হিসাব
মানুষের মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না।
একটি ক্ষুধার্ত শিশুর জীবন
কোনো মুনাফার অঙ্ক নয়।
একজন শ্রমিকের শরীর
ব্যবহার-শেষ-হয়ে-যাওয়া যন্ত্র নয়।
একজন কৃষকের ঘাম
পরিসংখ্যানের তুচ্ছ উপাত্ত নয়।
একজন বন্দীর অধিকার
কোনো শাসকের ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়।
মানুষের জীবন
মানুষেরই অধিকার।
এই কথাটুকু
যত দিন পৃথিবীতে উচ্চারণ করতে হবে,
তত দিন তোমার কাজ শেষ নয়।
যত দিন কোনো মায়ের চোখে
অসহায়তার জল জমে থাকবে,
তত দিন তোমার কবিতা শেষ নয়।
যত দিন শ্রমিকের মজুরি
তার বেঁচে থাকার অধিকার
নিশ্চিত করবে না,
তত দিন তোমার স্লোগান শেষ নয়।
যত দিন কোনো মানুষ
নিজের পরিচয়, মত কিংবা প্রশ্নের কারণে
অবমানিত হবে,
তত দিন তোমার প্রতিবাদ শেষ নয়।
তাই উঠে দাঁড়াও, কমরেড!
অন্ধকারের বিরুদ্ধে
আরেকটি সূর্য হওয়ার জন্য নয়,
মানুষের ভেতরে
সূর্য চিনে নেওয়ার সাহস জাগাতে।
ইতিহাসের একমাত্র নায়ক হওয়ার জন্য নয়,
সাধারণ মানুষকে
নিজেদের ইতিহাসের অংশ করতে।
পৃথিবীকে এক দিনে বদলে দেওয়ার
অলীক প্রতিশ্রুতি নিয়ে নয়,
প্রতিদিনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে
একটি করে সত্য উচ্চারণ করতে।
তুমি একা সব পারবে না—
এ কথা সত্য।
কিন্তু তুমি একা নও—
এ কথাও সত্য।
তোমার পাশে আছে
অধিকারহারা মানুষের দীর্ঘশ্বাস,
অবহেলিত মানুষের ইতিহাস,
ক্ষুধার্ত শিশুর ভবিষ্যৎ,
কৃষকের ঘামে ভেজা মাটি,
শ্রমিকের অসমাপ্ত স্বপ্ন।
আর আছে সেই সব মানুষের বিবেক,
যারা এখনো বিশ্বাস করে—
অন্যায় চিরস্থায়ী হতে পারে না।
কমরেড,
তোমার কাছে আমি
অমরত্ব চাই না।
চাই না ইতিহাসের প্রতিটি পাতায়
তোমার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকুক।
আমি শুধু চাই,
তুমি যেন নিজের বিবেকের কাছে
পরাজিত হয়ে না বাঁচো।
তোমার প্রতিবাদ যেন
কোনো নিরপরাধ মানুষের
কান্নার কারণ না হয়।
তোমার আদর্শ যেন
ক্ষমতার লোভে অন্ধ না হয়ে যায়।
তোমার স্বপ্ন যেন
মানুষের স্বাধীনতাকে
অস্বীকার না করে।
তুমি ভুল করলে স্বীকার করো,
পথ হারালে ফিরে এসো,
অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করো।
আর মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে
মানুষের কাছ থেকেই শেখো।
এই তো বিদ্রোহ,
এই তো বিপ্লবের নৈতিকতা।
এই তো সেই দীর্ঘ পথ,
যেখানে পতাকার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানুষ,
স্লোগানের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সত্য,
ক্ষমতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে
মানুষের মর্যাদা।
এখন বলো, কমরেড,
এখনই থেমে গেলে কেন?
তোমার সামনে যে পথ,
সেটি হয়তো দীর্ঘ,
হয়তো পাথুরে,
হয়তো অনিশ্চিত।
হয়তো সেই পথে
তোমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিও
একদিন বলবে—
ফিরে চলো,
আর কত?
তুমি তখন তার হাত ধরো,
তার ক্লান্তি বোঝো,
তার ক্ষতকে অবহেলা কোরো না।
কারণ মানুষকে ভালো না বেসে
মানুষের মুক্তির কথা বলা
সবচেয়ে বড় আত্মপ্রবঞ্চনা।
কিন্তু ক্লান্তি আর আত্মসমর্পণ
এক জিনিস নয়, কমরেড।
একটু বিশ্রাম নাও,
নিজের ক্ষত সারাও,
ভুলগুলোকে চিনে নাও।
তারপর আবার
মানুষের কাছে ফিরে এসো।
কারণ সংগ্রাম মানে
নিজেকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া নয়।
সংগ্রাম মানে
দীর্ঘ পথ চলার মতো করে
নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।
তোমার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখো,
তোমার সহমর্মিতাকে বাঁচিয়ে রাখো,
তোমার প্রশ্নকে বাঁচিয়ে রাখো।
তোমার ভেতরের মানুষটিকে
কোনো মূল্যেই বিক্রি কোরো না।
যেদিন দেখবে,
একজন ক্ষুধার্ত মানুষ
নিজের অধিকার নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে;
একজন শ্রমিক
ন্যায্য মজুরির দাবিতে
একলা নয়, সবার সঙ্গে কথা বলছে;
একজন তরুণ
হতাশার অন্ধকার পেরিয়ে
নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণে নেমেছে;
একজন নাগরিক
ভয়কে অতিক্রম করে
সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে—
সেদিন বুঝবে,
তোমার প্রতিটি সৎ প্রচেষ্টা
অর্থহীন হয়ে যায়নি।
বিপ্লব সব সময়
বারুদের শব্দে আসে না, কমরেড।
কখনো আসে বইয়ের পাতায়,
কখনো বিদ্যালয়ের দরজায়,
কখনো আদালতের নিরপেক্ষ রায়ে,
কখনো কারখানায়
শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায়।
কখনো আসে
একজন মানুষের
অন্য একজন মানুষের পাশে
নিঃশর্তভাবে দাঁড়ানোর মধ্যে।
আর কখনো—
একটি কবিতার ভেতর
জেগে ওঠে সেই আগুন,
যে আগুন মানুষকে পোড়ায় না,
মানুষের ঘুম ভাঙায়!
তাই কবিতা লিখো, কমরেড,
যদি তোমার হাতে কলম থাকে।
কথা বলো,
যদি তোমার কণ্ঠ থাকে।
সংগঠিত হও,
যদি তোমার পাশে মানুষ থাকে।
আর যদি আজ কিছুই না থাকে,
তবে অন্তত নিজের বিবেকটুকু
অন্ধকারের হাতে
তুলে দিয়ো না।
কারণ ইতিহাসের প্রতিটি অন্ধকার সময়ে
কেউ না কেউ
একটি ক্ষীণ আলো জ্বালিয়ে রেখেছে।
কেউ না কেউ
পরাজয়ের মাঝেও
মানুষের সম্ভাবনায় বিশ্বাস করেছে।
কেউ না কেউ
সবাই যখন বলেছে—শেষ,
তখন প্রশ্ন করেছে—
সত্যিই কি শেষ?
আজ সেই প্রশ্নটি
আমি তোমার দিকে ছুড়ে দিচ্ছি,
কমরেড।
এখনই থেমে গেলে কেন?
মানুষের এখন তো কম রেট—
খুব সস্তা অবস্থা!
কিন্তু মানুষের দাম কমে যাওয়ার
এই নির্মম সময়েই
মানুষের মর্যাদার কথা
সবচেয়ে জোরে বলতে হয়।
যে পৃথিবী মানুষকে পণ্যে পরিণত করে,
সেই পৃথিবীতে
মানুষকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেয়ে
বড় বিদ্রোহ আর কী হতে পারে?
যে সময় বিবেককে
বিক্রির জন্য তোলে,
সে সময় নিজের বিবেককে
অক্ষত রাখার চেয়ে
বড় সাহস আর কী হতে পারে?
যে সমাজ নীরবতাকে নিরাপত্তা বলে,
সে সমাজে সত্য উচ্চারণের চেয়ে
বড় দায়িত্ব আর কী হতে পারে?
তাই থেমো না, কমরেড—
যদিও তোমার পথ দীর্ঘ,
যদিও তোমার সঙ্গী কম,
যদিও তোমার কণ্ঠ ক্লান্ত,
যদিও তোমার চোখে
অনেক পরাজয়ের জল।
থেমো না মানে
অন্ধভাবে ছুটে চলা নয়।
থেমো না মানে
মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা
হারিয়ে না ফেলা।
থেমো না মানে
প্রতিটি লড়াইয়ে জিততেই হবে—এমন নয়।
থেমো না মানে
পরাজয়ের পরও
সত্যকে সত্য,
অন্যায়কে অন্যায়
বলার সাহস ধরে রাখা।
থেমো না মানে
কোনো নেতার অন্ধ অনুসারী হওয়া নয়।
কোনো পতাকার নামে
বিবেক বিসর্জন দেওয়া নয়।
মানুষের মুক্তির স্বপ্নকে
নিজের ক্ষমতার সিঁড়ি হতে না দেওয়া।
কমরেড,
পৃথিবীকে বদলানোর আগে
নিজেকে প্রশ্ন করো,
নিজেকে বদলাও।
তারপর মানুষের সঙ্গে
একটি ন্যায়ভিত্তিক পৃথিবী গড়ার
দীর্ঘ যাত্রায় নেমে পড়ো।
হয়তো তোমার জীবদ্দশায়
সব অন্যায়ের অবসান হবে না।
হয়তো তোমার স্বপ্নের পৃথিবী
তোমার চোখে দেখা হবে না।
হয়তো তোমার নামও
ইতিহাসের কোনো পাতায় থাকবে না।
তবু তুমি যদি
একজন মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারো,
একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে
সত্যের সাক্ষ্য দিতে পারো,
একটি মিথ্যার মুখোশ খুলতে পারো,
একটি শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষায়
একটি সৎ পদক্ষেপ নিতে পারো—
তবে তোমার জীবন
শুধু নিজের জন্য বেঁচে থাকার
সংকীর্ণ হিসাবের মধ্যে
আটকে থাকবে না।
তোমার অস্তিত্ব
অন্য মানুষের জীবনে
একটি অর্থ রেখে যাবে।
আর সেই অর্থই
মানুষের প্রকৃত মূল্য।
যে মূল্য কোনো বাজার জানে না,
কোনো মুদ্রা মাপতে পারে না,
কোনো ক্ষমতা নির্ধারণ করতে পারে না।
তাই, কমরেড,
এখনই থেমে যেয়ো না।
পৃথিবী এখনো
মানুষের হয়নি!
মানুষ সস্তা হয়ে গেছে বলে
মানুষের জন্য লড়াই সস্তা নয়।
সত্য একা হয়ে গেছে বলে
সত্যের মূল্য কমে যায়নি।
পৃথিবী নিষ্ঠুর হয়েছে বলে
মানবিকতা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েনি।
তোমার হাতে যদি
একটি শব্দও অবশিষ্ট থাকে,
সেই শব্দ দিয়ে
মানুষের পক্ষে দাঁড়াও।
তোমার ভেতরে যদি
এক বিন্দু সাহসও অবশিষ্ট থাকে,
সেই সাহস দিয়ে
ভয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও।
তোমার হৃদয়ে যদি
এক ফোঁটা ভালোবাসাও অবশিষ্ট থাকে,
সেই ভালোবাসা দিয়ে
ঘৃণার দেয়ালে
একটি জানালা খোলো।
কারণ শেষ পর্যন্ত
পৃথিবী কোনো একক কমরেডের নয়,
কোনো একক নেতার নয়,
কোনো একক দলের নয়,
কোনো একক মতবাদেরও নয়।
পৃথিবী তাদের,
যারা পৃথিবীকে
আরও ন্যায়পূর্ণ,
আরও মানবিক,
আরও স্বাধীন
এবং আরও বাসযোগ্য
করে তুলতে চায়।
আর সেই পৃথিবীর পথে
আজও যদি কেউ তোমাকে জিজ্ঞেস করে—
কমরেড,
এত বাধা,
এত ক্লান্তি,
এত অবহেলা,
এত পরাজয়ের পরও
তুমি কেন থামছ না?
তবে মাথা উঁচু করে বলবে—
আমি থামিনি,
কারণ মানুষ এখনো মানুষ।
আমি থামিনি,
কারণ অন্যায় এখনো অন্যায়।
আমি থামিনি,
কারণ সত্যের এখনো প্রয়োজন আছে।
আমি থামিনি,
কারণ মানুষের মর্যাদা
কোনো বাজারের পণ্য নয়।
আমি থামিনি, কমরেড।
আমি শুধু শিখেছি—
কখনো কীভাবে দাঁড়াতে হয়,
কখনো কীভাবে শুনতে হয়,
কখনো কীভাবে ভুল স্বীকার করতে হয়।
আর কখনো কীভাবে
সমস্ত অন্ধকারের সামনে দাঁড়িয়ে
একটি ছোট্ট আলোকে
দুই হাত দিয়ে আগলে রাখতে হয়।
মানুষের দাম কমে গেছে—
তাই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর
দায় আমার আরও বেড়েছে।
এই আমার বিদ্রোহ,
এই আমার অঙ্গীকার,
এই আমার পতাকার অর্থ,
এই আমার কবিতার শেষ উচ্চারণ—
এখনই থেমে গেলে কেন, কমরেড?
পৃথিবী এখনো
মানুষের হয়নি!ডের নয়,
কোনো একক নেতার নয়,
কোনো একক দলের নয়,
কোনো একক মতবাদেরও নয়।
পৃথিবী তাদের,
যারা পৃথিবীকে
আরও ন্যায়পূর্ণ,
আরও মানবিক,
আরও স্বাধীন
এবং আরও বাসযোগ্য
করে তুলতে চায়।
আর সেই পৃথিবীর পথে
আজও যদি কেউ তোমাকে জিজ্ঞেস করে—
কমরেড,
এত বাধা,
এত ক্লান্তি,
এত অবহেলা,
এত পরাজয়ের পরও
তুমি কেন থামছ না?
তবে মাথা উঁচু করে বলবে—
আমি থামিনি,
কারণ মানুষ এখনো মানুষ।
আমি থামিনি,
কারণ অন্যায় এখনো অন্যায়।
আমি থামিনি,
কারণ সত্যের এখনো প্রয়োজন আছে।
আমি থামিনি,
কারণ মানুষের মর্যাদা
কোনো বাজারের পণ্য নয়।
আমি থামিনি, কমরেড।
আমি শুধু শিখেছি—
কখনো কীভাবে দাঁড়াতে হয়,
কখনো কীভাবে শুনতে হয়,
কখনো কীভাবে ভুল স্বীকার করতে হয়।
আর কখনো কীভাবে
সমস্ত অন্ধকারের সামনে দাঁড়িয়ে
একটি ছোট্ট আলোকে
দুই হাত দিয়ে আগলে রাখতে হয়।
মানুষের দাম কমে গেছে—
তাই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর
দায় আমার আরও বেড়েছে।
এই আমার বিদ্রোহ,
এই আমার অঙ্গীকার,
এই আমার পতাকার অর্থ,
এই আমার কবিতার শেষ উচ্চারণ—
এখনই থেমে গেলে কেন, কমরেড?
পৃথিবী এখনো
মানুষের হয়নি!