
“মানবাধিকার, আমাদের নিত্যদিনের অপরিহার্য”: ঐতিহাসিক ভিত্তি ও সমসাময়িক চ্যালেঞ্জের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ বিশ্ব মানবাধিকার দিবস।
প্রধান বার্তা সম্পাদক ও প্রকাশক- জাহারুল ইসলাম জীবন এর বিশেষ নিউজ প্রতিবেদন।
আজ ১০-ই ডিসেম্বর, বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। ১৯৪৮ সালের এই দিনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র’ (Universal Declaration of Human Rights – UDHR) গৃহীত হওয়ার ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণ করে প্রতি বছর এই দিবসটি উদযাপন করা হয়। এই বছর- ২০২৫ এর প্রতিপাদ্য “মানবাধিকার, আমাদের নিত্যদিনের অপরিহার্য” বিশ্বকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে- মৌলিক অধিকার শুধু আইনের বইয়ে লিপিবদ্ধ একটি বিষয় নয়, বরং প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, মর্যাদা ও স্বাধীনতার ভিত্তি।
বিশ্ব মানবতার ‘মহাসনদ’:- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বিশ্বনেতাদের মানুষের মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করিয়েছিল। সেই তাগিদেই নবগঠিত জাতিসংঘ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা রাজনৈতিক বিশ্বাস নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য একটি সর্বজনীন সনদ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়।
মানবাধিকারের জন্মলগ্ন (১৯৪৮):- যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্ট লেডি এলেনর রুজভেল্টের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত UDHR, ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর গৃহীত হয়। এটিতে মোট ৩০টি ধারা রয়েছে, যা জীবনের অধিকার, স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, শিক্ষার অধিকার, নির্যাতন থেকে মুক্তি এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারসহ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে।
মানবাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য:- UDHR আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং ১৯৫০ সাল থেকে দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মানবাধিকার দিবস হিসেবে উদযাপন করা হচ্ছে। একে প্রায়শই ‘বিশ্ব মানবতার ম্যাগনা কার্টা’ বলা হয়।
মানবাধিকারের সমসাময়িক প্রেক্ষাপট্:- সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ ও সংগ্রামের চিত্র ধারন করে ঐতিহাসিক ঘোষণার পঁচাত্তর বছর পেরিয়ে গেলেও বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকারের সার্বজনীনতা বহুবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে। ন্যায় বিচার, মানুষের মৌলিক অধিকার, বাক স্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা, সুস্থ রাজনৈতিক ধারার প্রেক্ষাপট্, অযৌক্তিক যুদ্ধ, যত্রতত্র মারণাস্ত্রের ব্যবহার, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম-খুন-নারী ধর্ষণ ও হত্যা, নানামুর্খী অযৌক্তিক সংঘাত, মানবতা বিরোধী বৈষম্য সৃষ্টি করন হেতু সমাজ-দেশে এবং বিশ্বের বিভিন্ন পরিস্থিতিগত জটিলতা, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য সুরক্ষায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
** চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্র মূল সমস্যার বাস্তব উদাহরণ:- বৈশ্বিক সংঘাত ও মানবিক সংকট, গাজায় বর্বরোচিত হামলা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের উপর নির্বিচার আক্রমণ, ইউক্রেন যুদ্ধ ও রোহিঙ্গা সংকটের মতো ঘটনায় বাস্তুচ্যুতি ও শরণার্থী সমস্যা।
** মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের উপর হামলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা অনুরূপ আইনের অপব্যবহার করে মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধ।
** আর্থ-সামাজিক বৈষম্য | দারিদ্র্য, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগে বৈষম্য; কোভিড-১৯ মহামারীর সময় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে বৈষম্য বৃদ্ধি।
** জলবায়ু পরিবর্তন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয় গরিব ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা এবং আশ্রয়ের অধিকারকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছে।
বাংলাদেশের অঙ্গীকার ও অগ্রগতি:- স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারের নেতৃত্বে প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সকল মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে। দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষায় সুযোগের বিস্তার, নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধিতে (যেমন: গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি) বাংলাদেশের সাফল্য প্রশংসনীয়।
** জাতীয় মানবাধিকার কমিশন:- দেশে মানবাধিকার সুরক্ষায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
** মানবাধিকারের চ্যালেঞ্জ সমূহ্:- নারী নির্যাতন, শিশুশ্রম, এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা এখনো উদ্বেগজনক। ভুক্তভোগীদের প্রতিকার পাওয়া এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উপর জোর দিতে হবে।
সর্বপরি, সংহতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে এই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে বিশ্ববাসীকে আবারও সংহতি ও সহমর্মিতার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। মানবাধিকার রক্ষা কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সচেতনতাই পারে একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। মানবাধিকারকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই হোক আজকের মানবাধিকার দিবসের প্রধান আশান্বিত দৃঢ় সংকল্পিত বিশ্ব অঙ্গীকার।
Leave a Reply