
একসময় পদ্মা নদীর পাড় মানেই ছিল অনিশ্চয়তা, ভাঙন আর ক্ষতির শঙ্কা। বর্ষা এলেই বসতভিটা আর ফসল হারানোর আতঙ্কে দিন কাটত চরবাসীর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই চিত্র। ফরিদপুরে পদ্মা নদীর তীরবর্তী চর ও নদী পাড়ের জমিতে আগাম (মুড়ি কাটা) পেঁয়াজ চাষ করে এখন লাভের মুখ দেখছেন চাষিরা।
নদীবিধৌত এই এলাকায় আগাম পেঁয়াজ উৎপাদন হয়ে উঠেছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নাম।
ফরিদপুর সদর, চরভদ্রাসন, সদরপুর উপজেলার পদ্মাপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন চোখে পড়ে সবুজ পেঁয়াজ ক্ষেত। দূর থেকে তাকালেই মনে হয় সবুজ কার্পেট বিছানো হয়েছে নদীর পাড় ঘেঁষে। এসব ক্ষেতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন চাষিরা।
তা ছাড়া সালথাসহ আশপাশের উপজেলাতেও কিছুটা মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষাবাদ হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণ মৌসুমের তুলনায় আগাম (মুড়ি কাটা) পেঁয়াজ চাষে লাভ বেশি। সাধারণত অক্টোবরের শেষের দিকে গুটি পেঁয়াজ রোপণ করা হয়। ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির শুরুতেই পেঁয়াজ তোলা শুরু হয়।
এই সময় বাজারে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ কম থাকায় দাম তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। ৬০-৭০ দিনের মধ্যেই তুলে পেঁয়াজ বাজারজাত করা যায়। ফলে অন্যান্য রবি ফসলের তুলনায় কম সময়ে বেশি লাভ পাওয়া সম্ভব হয়।
ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের গোলডাঙ্গী গ্রামের পদ্মাপাড়ের কৃষক শেখ জলিল বলেন, আমি দুই বিঘা জমিতে মুড়ি কাটা পেঁয়াজ চাষ করেছি। সার ও ওষুধের দাম বেশি হওয়ায় প্রতি বিঘায় (৩৩ শতাংশ) প্রায় ৬০-৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
খরচ বেশি হলেও দুই বিঘায় ১০০ মনের বেশি পেঁয়াজ হয়েছে, যা বিক্রি করে পাওয়া যাবে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। পেঁয়াজ তোলার পরেই জমি থেকে মণপ্রতি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছি। তিনি বলেন, বেশি দাম পাওয়ার আশায় কাঁচা পেঁয়াজই তুলেছি, কারণ এলসি এসে গেলেই দাম পড়ে যাবে।
কৃষি বিভাগ বলছে, ফরিদপুরে এ বছর আগাম পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার ২৮০ হেক্টর জমি, সেখানে ৫ হাজার ৩৬৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। এখান থেকে ৮২ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। পদ্মাপাড়ের বেলে-দোআঁশ মাটি আগাম পেঁয়াজ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এই মাটিতে পানি দ্রুত নেমে যায়, ফলে পচন বা রোগবালাই কম হয়। পাশাপাশি শীত মৌসুমের রোদ ও হালকা ঠাণ্ডা আবহাওয়া মুড়ি কাটা পেঁয়াজের গঠন ও স্বাদে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে জানান, মুড়ি কাটা পেঁয়াজ মূলত আগাম জাত। ফরিদপুর সদর, সদরপুর উপজেলার পদ্মা পাড়ে বেশি চাষাবাদ হয়েছে। পদ্মা পাড়ে সঠিক পরিচর্যা করলে বিঘাপ্রতি ভালো ফলন পাওয়া যায়। এতে চাষিরা অল্প সময়েই লাভের মুখ দেখেন।
এ ছাড়া মধুখালী, সালথা ও বোয়ালমারীতেই মুড়ি কাটা পেঁয়াজের চাষাবাদ হয়েছে। ইতিমধ্যেই বাজারে আগাম পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমান দাম অনুযায়ী ভোক্তা ও চাষিদের জন্য বাজার দর উপযোগী রয়েছে। এ বছর অনেক চাষি ক্ষেত থেকেই পাইকারদের কাছে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। ফলে চাষিদের পরিবহন খরচ ও ঝুঁকি কিছুটা কমছে। পদ্মা পাড়ের পেঁয়াজ ফরিদপুরের হাট ছাড়িয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বাজারে যাচ্ছে।
পাশের রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দুদুখান পাড়া গ্রামের চাষি শামচু শেখ মঙ্গলবার বলেন, লিজ নিয়ে তিন বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষ করেছি। উঠানোর সময় ক্ষেত থেকে পাইকার নিয়ে যায় বলে ঝামেলা কম। দামও ঠিকঠাক পাই। আগে ফড়িয়াদের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হত। কয়েক দিন আগে যারা পেঁয়াজ তুলেছে, তারা ভালো দাম পেয়েছে। শুনছি এলসি এসে যাচ্ছে, তাই কাঁচা পেঁয়াজ তোলা শুরু করেছি। এখন ২ হাজার ১০০ টাকা থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে। এ বছর শ্রমিক, সার ও ওষুধের যে দাম তাতে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আসলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব।
জেলায় আগাম পেঁয়াজের চাষাবাদে নারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। পেঁয়াজ তোলা, কাটা, পরিষ্কার ও বাছাইয়ের কাজ করছেন নারীরা। এতে চর ও নদীপাড় এলাকার নারীদের জন্য তৈরি হচ্ছে অস্থায়ী কর্মসংস্থান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী শ্রমিক বলেন, প্রতি ঝুড়ি পেঁয়াজ কেটে ৫০-৬০ টাকা পাচ্ছি। এতে সংসারের খরচে সহযোগিতা হচ্ছে।
তবে পেঁয়াজের দাম ওঠানামা করায় বিপাকে পড়তে হচ্ছে মাঝারি ব্যবসায়ীদের। ফরিদপুর সদরের গোলডাঙ্গী মাঠে পেঁয়াজ কিনতে আসা ব্যবসায়ী আবুল বাশার বলেন, আমি নর্থ চ্যানেল ও চরমাধুবদী ইউনিয়নের চরের জমিতে গিয়ে পেঁয়াজ কিনে ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর ও খুলনায় বিক্রি করি। গত সপ্তাহে ৩ হাজার ৭০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ২ হাজার ৬০০ টাকা মন দরেও মাঠ থেকে পেঁয়াজ কিনেছি। হঠাৎ করে শুনলাম এলসি এসেছে, যার কারণে কেনা দামের চেয়েও কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়েছে। এ জন্য এলসি বন্ধ থাকলে আমাদের ভালো হয়। বর্তমানে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা মন দরে পেঁয়াজ কেনা হচ্ছে।
ফরিদপুরে পদ্মা পাড়ে আগাম পেঁয়াজ চাষ চাষিদের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। নদীভাঙন আর অনিশ্চয়তার মাঝেও সবুজ এই ফসল হয়ে উঠেছে স্বাবলম্বিতার প্রতীক। তবে কৃষকরা বলছেন, পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাবে ন্যায্য দামের জন্য অপেক্ষা করতে পারেন না তারা। বাজারে যে দাম চলছে সেই দামেই বিক্রি করে দিতে হয়। তাদের দাবি, সরকারি সহায়তা ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার দিকে নজর দিলে এই খাত আরো এগিয়ে যাবে।
সূত্র কালের কণ্ঠ
Leave a Reply