1. shahinsalman99@gmail.com : Dhakar somoy : Dhakar somoy
  2. bditwork247@gmail.com : admin : Badhon Sarkar
  3. thedhakarsomoy@gmail.com : thedhakarsomoy :
শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৮:২৯ পূর্বাহ্ন

স্কুল আছে, শিক্ষা নেই—হাওরের ১০৯ শিশুর নীরব আর্তনাদ

অমিত তালুকদার, সুনামগঞ্জ
  • Update Time : রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
  • ০ Time View

স্কুল আছে, শিক্ষা নেই—হাওরের ১০৯ শিশুর নীরব আর্তনাদ

 

অমিত তালুকদার, সুনামগঞ্জ

হাওরবেষ্টিত এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়—বাইরে থেকে দেখলে স্বাভাবিক, কিন্তু কাছে গেলেই ধরা পড়ে নির্মম বাস্তবতা। শ্রেণিকক্ষের দরজায় ঝুলছে তালা। শিক্ষক নেই, পাঠদান নেই। অথচ বিদ্যালয়টি সরকারি। শিক্ষা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলেও থলেরবন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সেই দায়িত্ব কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে।

 

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার শিমুলবাগ ইউনিয়নের থলেরবন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের দেরিতে আসা এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে বিদ্যালয়ের ১০৯ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন পড়েছে চরম অনিশ্চয়তায়।

 

স্থানীয় এক অভিভাবক আক্ষেপ করে বলেন, “স্যার, আমরা বাচ্চা নিয়া স্কুলে পাঠাই, আইসা দেখি তালা। মাসে কয়দিন স্কুল খোলা থাকে, আমরাও জানি না।”

 

সরেজমিনে দুপুর ২টায় বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, যেখানে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পাঠদান চলার কথা, সেখানে দুপুর গড়াতেই বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। অথচ ১০–১২ জন শিক্ষার্থী তখনো স্কুল ইউনিফর্ম পরে রোদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল।

 

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রিমান ও সফুল হাসান জানায়,

“স্যাররা প্রতিদিন ১১টার দিকে আসেন। ২টা বাজলেই স্কুল ছুটি দিয়ে দেন। যাওয়ার সময় বলেন, কেউ জিজ্ঞেস করলে যেন বলি বিকেল ৪টায় ছুটি হয়েছে। কোনোদিন ক্লাস হয়, কোনোদিন একদমই না। তারা শুধু অফিসে বসে মোবাইল টিপেন আর চা খান।”

 

ঘটনার সময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুমন কান্তি তালুকদারকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন যে তিনি বিদ্যালয়েই আছেন। তবে সংবাদকর্মীদের উপস্থিতির কথা জানতে পেরে কিছুক্ষণ পর দুই সহকারী শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে তড়িঘড়ি করে বিদ্যালয়ে আসেন তিনি। এ সময় মুখে মাস্ক পরে অফিস কক্ষের তালা খুললেও শ্রেণিকক্ষগুলো তখনো তালাবদ্ধ ছিল। শিক্ষার্থীরা বাইরে দাঁড়িয়ে শিক্ষকদের এই লুকোচুরি প্রত্যক্ষ করে। সহকারী শিক্ষক সুবল চন্দ্র দাসের অনুপস্থিতির বিষয়ে প্রধান শিক্ষক কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

 

বিদ্যালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০৯ জন হলেও বাস্তবে পাঠদানের চিত্র ভিন্ন। অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের কোনো ক্লাস আজ পর্যন্ত নিয়মিত নেওয়া হয়নি। শিশুদের শিক্ষার বুনিয়াদ গড়ার গুরুত্বপূর্ণ এই স্তরটি শিক্ষকদের অবহেলায় কার্যত পরিত্যক্ত।

 

নির্ধারিত সময়ের আগেই স্কুল বন্ধের কারণ জানতে চাইলে সহকারী শিক্ষক আব্দুল হালিম ও শাহানূর মিয়া দাবি করেন, “প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে আমরা গণভোটের প্রচারে গেছি।”

প্রধান শিক্ষকও একই বক্তব্য দেন এবং দায় চাপান উপজেলা শিক্ষা অফিসের ওপর। তবে সাধারণ কর্মদিবসে পাঠদান বন্ধ রেখে এমন ‘প্রচার কার্যক্রমে’ যাওয়ার পক্ষে কোনো লিখিত আদেশ বা বৈধ প্রমাণ তারা দেখাতে পারেননি।

 

শিক্ষকদের এই চরম অবহেলার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুল থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। খালেদা বেগম বলেন,

“আমার তিন সন্তান এই স্কুলে পড়ে, কিন্তু তারা নিজের নামও ঠিকমতো লিখতে পারে না। শিক্ষকরা সরকারি বেতন নেন, আর আমাদের বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছেন।”

 

আরেক অভিভাবক মল্লিকা বেগম বলেন,

“প্রতিদিন নাতিকে নিয়ে আসি, দেখি স্কুল বন্ধ। ১১টায় স্যাররা আসেন, আবার ঘণ্টাখানেক পরেই চলে যান। স্কুলটা এখন তাদের আড্ডাখানা।”

এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, নির্ধারিত সময়ের আগে স্কুল বন্ধ রাখা বা দেরিতে আসার কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা দ্রুত অভিযুক্ত শিক্ষকদের অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের হুঁশিয়ারি, অবিলম্বে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত না হলে তারা বৃহত্তর আন্দোলনে যাবেন।

শিক্ষা কোনো দয়া নয়—এটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু হাওরের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা থলেরবন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দিনের পর দিন সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে একটি প্রজন্ম শিক্ষার আলো থেকেই ছিটকে পড়বে—এটাই এখন এলাকাবাসীর সবচেয়ে বড় শঙ্কা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2026
Design By BDit.com.bd