
কৃষকের আস্থা ভাঙছে কেন? হাওর রক্ষা বাঁধে অনিয়মের অভিযোগে তোলপাড়
অমিত তালুকদার, সুনামগঞ্জ।
শাল্লা উপজেলায় হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে নজিরবিহীন প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে ‘পকেট কমিটি’ গঠনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম মেনে প্রকল্পের বড় অংশ সম্পন্ন করার পরও রহস্যজনকভাবে ১২২ ও ৭১ নম্বর পিআইসি’র কার্যাদেশ বাতিল করায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। একই সঙ্গে ৭০ নম্বর পিআইসিতে জমিহীন ব্যক্তি ও হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামিকে নেতৃত্বে আনার অভিযোগে প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে গভীর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছায়ার হাওড় উপ-প্রকল্পের আওতায় জগন্নাথপুর হতে বিষ্ণুপুর নতুনহাটি (১২২ নম্বর) এবং বিষ্ণুপুর নতুনহাটি হতে সেচ পাম্প পর্যন্ত (৭১ নম্বর) পিআইসি গঠন করা হয়। নীতিমালা অনুসরণ করে গঠিত কমিটিগুলো বৈধ কার্যাদেশ (ওয়ার্ক অর্ডার) পেয়ে ব্যাংক হিসাব খুলে দ্রুত গতিতে কাজ শুরু করে।
১২২ নম্বর পিআইসি’র সদস্য রাধাগোবিন্দ দাস জানান, তারা ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ মাটির কাজ সম্পন্ন করেছেন। ৭১ নম্বর পিআইসি’র সদস্য প্রসেনজিত দাস বলেন, তাদের প্রকল্পের ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু কোনো লিখিত কারণ ছাড়াই হঠাৎ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় উপ-সহকারী প্রকৌশলী মৌখিকভাবে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। পরে কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে প্রশাসনের একটি প্রভাবশালী মহল এ বেআইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের দাবি, “কাজ শেষের পথে—ঠিক তখনই বাতিল। উদ্দেশ্য পরিষ্কার—নতুন করে ভাগবাটোয়ারা।”
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ৭০ নম্বর পিআইসি গঠন নিয়ে। কৃষক শনিলাল দাসের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, এই কমিটির সদস্য সচিব রাজেন্দ্র চন্দ্র দাসের প্রকল্প এলাকায় কোনো জমি নেই। অন্যের জমি বা বিক্রিত সম্পত্তির খতিয়ান ব্যবহার করে তিনি কমিটিতে স্থান পেয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ—এই কমিটির সভাপতি প্রদীপ চন্দ্র দাস উত্তরা পূর্ব থানায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলার (মামলা নং-১৩, ২৬/০৯/২০২৪) এজাহারভুক্ত আসামি। একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি কীভাবে হাওর রক্ষা প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এলেন—এ প্রশ্নে এলাকাজুড়ে তোলপাড় চলছে।
বারবার অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার না পেয়ে কৃষকরা হতাশ। গত ৮ জানুয়ারি ইউএনও’র কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ায় ১৯ ফেব্রুয়ারি তারা সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা করার চেষ্টা করেন। সকাল থেকে অপেক্ষা করেও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে না পারায় ক্ষোভ আরও বাড়ে।
জেলা প্রশাসক ড. ইলিয়াস মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অফিসিয়াল মোবাইলে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও কোনো ব্যাখ্যা না পাওয়ায় আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকরা।
শাল্লা উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ওবায়দুল হক বলেন, “নীতিমালার আলোকে কাজ করা হয়েছে। ১২২ ও ৭১ নম্বর পিআইসি’র কাজে কিছু কারিগরি ত্রুটি ও স্থানীয় বিরোধ ছিল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নতুন কমিটি দেওয়া হয়েছে।” তবে কাজ চলমান অবস্থায় কার্যাদেশ বাতিলের যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা বলছেন, পিআইসি গঠনে অনিয়ম নতুন নয়; কিন্তু কাজের ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার পর কার্যাদেশ বাতিল এবং হত্যা মামলার আসামিকে দায়িত্ব দেওয়া নজিরবিহীন। দ্রুত স্বচ্ছ তদন্ত ও ব্যবস্থা না নিলে ছায়ার হাওরের হাজার হাজার একর বোরো ফসল আসন্ন বর্ষায় অকাল ডুবির ঝুঁকিতে পড়বে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ না এলে কঠোর রাজপথের কর্মসূচিতে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ক্ষুব্ধ কৃষকরা।
Leave a Reply